kalerkantho


এককে বিএনপি দ্বৈতে আ. লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এককে বিএনপি দ্বৈতে আ. লীগ

হাওরাঞ্চলে গত বছরের বন্যার পর এখনো ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি নেত্রকোনা-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী উপজেলার বহু মানুষ। বাঁচার তাগিদে ঘর ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে বহু পরিবার। সাধারণ যেসব মানুষ এলাকায়ই আছে তাদেরও যেন আগামী নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো ভাবনা নেই। তবে হাট-বাজার, চায়ের দোকান বা আড্ডায় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ যে একবারেই হয় না তা নয়।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ আসনে বিএনপি নেতা কারাবন্দি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনাজ্জামান শ্রাবণীকেই তাদের দলের সম্ভাব্য একক প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁদের একজন বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) রেবেকা মমিন। আরেকজন ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। সম্প্রতি মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আইটি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার এ আসনের খালিয়াজুরী উপজেলার সন্তান।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতা শফি আহমেদের নামও শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তাহমিনাজ্জামান শ্রাবণীর বাইরে কেবল আরেক নেতা কর্নেল (অব.) আতাউর রহমানের নাম আলোচনায় আছে। তবে তিনি এলাকায় নেই।

সাধারণ ভোটাররা মনে করে, কারাবন্দি বাবরের স্ত্রী তাহমিনাজ্জামান স্বামীর কারণে ‘সিমপ্যাথি ভোট’ পেতে পারেন। তা ছাড়া তিন উপজেলায়ই বাবরের রিজার্ভ ভোট আছে।

আর এই তিন উপজেলায় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থানও বেশ শক্তিশালী। কেননা গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মদন ও মোহনগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের হারিয়ে জিতেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। তবে দলীয় কোন্দলের কারণে খালিয়াজুরী উপজেলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হন।

তবে আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। সে ক্ষেত্রে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী তাহমিনাজ্জামানের ‘সিমপ্যাথি ভোট’ ঠেকাতে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার না বর্তমান এমপি রেবেকা মমিন মনোনয়ন পান তাই দেখার বিষয়। মোস্তাফা জব্বার মনোনয়ন পেলে তাহমিনাজ্জামানকে হারানো সহজ হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তবে ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এ দুজন শক্তিশালী প্রার্থী মনোনয়ন পেলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আগামী নির্বাচনে। কেননা অতীতে এ আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত আবদুল মমিন। তাঁর বিপরীতে ছিলেন বিএনপি প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করাবন্দি লুত্ফুজ্জামান বাবর। ২০০১ সালে বাবর এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন। আর মমিন মনোনয়ন পান দুটি আসনে। নেত্রকোনা-৪ (মোহনগঞ্জ-মদন-খালিয়াজুরী) ও নেত্রকোনা-২ (নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টা) আসন থেকে। সেই নির্বাচনে মমিন তাঁর নিজ আসনে হেরে যান এবং নেত্রকোনা সদর আসন থেকে  বিজয়ী হন।

জেলা সদরের এমপি থাকা অবস্থায় আবদুল মমিন মারা যান। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মমিনের স্ত্রী রেবেকা মমিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এ আসন থেকে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থী হওয়ায় লুত্ফুজ্জামান বাবর বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হন। তবে বাবর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেও রেবেকা মমিনের কাছে হেরে যান। ওই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল কর্নেল (অব.) আতিকুল হককে। কিন্তু তাঁর ভরাডুবি হয়।

এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার এমপি নির্বাচিত হন রেবেকা মমিন। এরই মধ্যে তিন উপজেলায় এমপি রেবেকা মমিনের প্রতিপক্ষ গ্রুপ বাড়তে থাকে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হয়ে আসেন মোহনগঞ্জের প্রয়াত এমএলএ মুক্তিযোদ্ধা ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদের ছেলে সাজ্জাদুল হাসান। তিনি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি এলাকায় এসে এ আসনে আওয়ামী লীগের সব পক্ষকে এক করেছেন। সেই সঙ্গে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছেন তিনি। একজন আমলা হয়ে এত সব উন্নয়নে এগিয়ে আসায় সাজ্জাদুল হাসান এমপি নির্বাচন করবেন কি না এমন আলোচনা আছে বিভিন্ন মহলে।

আর এ আসনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থীর নাম প্রচারে বা আলোচনায় নেই।

আলোচিতদের বক্তব্য : এ আসন থেকে আগামীতে নির্বাচন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মনোনয়ন দেওয়া-না দেওয়া তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। উনি যদি আমাকে নির্দেশ দেন তাহলে তো আর আমি তা অগ্রাহ্য করতে পারব না।’

তবে সাজ্জাদুল হাসান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবহেলিত হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে খুবই আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রী চান পদ্মা সেতুর মতো হাওরাঞ্চলের উন্নয়নের কথাও যেন হাওরবাসী আজীবন মনে রাখে। আমি প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের বার্তা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি মাত্র।’

দুইবার নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন কি না জানতে চাইলে বর্তমান এমপি রেবেকা মমিন বলেন, ‘আমার আমলে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, শতভাগ বিদ্যুতায়ন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে তিন উপজেলায়। এসব কথা আমি আমার মুখ দিয়ে বলতে চাই না। এলাকার লোকজনের কাছ থেকেই জানতে পারবেন। আমি আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইব।’

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক নেতা শফি আহামেদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর সম্পর্কে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গাজী মোজাম্মেল হক টুকু বলেন, ‘২০০১ সালে শফি আহামেদ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের সাথে পাল্লা দিয়ে অন্দোলন-সংগ্রাম করে তিন উপজেলার নেতাকর্মীদের নিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছেন। একমাত্র তিনিই এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সাথে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে আসনটি ধরে রাখতে পারবেন।’

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী তাহমিনাজ্জামান শ্রাবণী বিদেশে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর স্বামী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবরের একসময়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, আইনি জটিলতায় বাবর নির্বাচন করতে না পরলে দল থেকে তাঁর স্ত্রীকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।



মন্তব্য