kalerkantho


বই পড়ে জীবনে অসংখ্যবার খুব অনুপ্রাণিত হয়েছি

আসাদুজ্জামান নূর

নওশাদ জামিল   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




বই পড়ে জীবনে অসংখ্যবার খুব অনুপ্রাণিত হয়েছি

বাসন্তী রঙে ঝলমল করছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ। উৎসবে শামিল হতে গত মঙ্গলবার বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে এসেছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি পরেছিলেন তিনি। মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে তিনি যখন গ্রন্থমেলায় প্রবেশ করেন, চারপাশ থেকে তাঁকে ঘিরে ধরে নানা বয়সের মানুষ, পাঠক ও দর্শনার্থীরা। সবাই তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে উন্মুখ।

‘সেই চিরচেনা হাসি’ ছড়িয়ে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আমার সঙ্গে যাঁরা ছবি ওঠাতে চান, তাঁরা আগে বই কিনে নিয়ে আসুন। যাঁর হাতে বই থাকবে, তাঁর সঙ্গেই ছবি ওঠাব। অবশ্য আমাকে যদি কেউ বই উপহার দেন, তাঁর সঙ্গে তুলব একাধিক সেলফি!’ ছবি তোলা শেষে একটি প্রকাশনা সংস্থার প্যাভিলিয়নে বসেন তিনি। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা।

বাসন্তী রঙের পোশাক পরা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের দেখতে দেখতে নূর বলছিলেন, ‘প্রত্যেকের জীবনই কালারফুল হওয়া উচিত, নিজের মতো করে। সবাই রঙিন জীবন যাপন করুক, আনন্দময় জীবন যাপন করুক, সত্য ও সুন্দর থাকুক—এটিই তো চাই।’

সত্য ও সুন্দরের পথে নিরন্তর যাত্রী বহুমাত্রিক মানুষ আসাদুজ্জামান নূর। একটিমাত্র পরিচয়ে তাঁর সীমা টানা যাবে না। তিনি মঞ্চে কালজয়ী বহু কাজ করেছেন, টেলিভিশনে কাজ করেছেন, কাজ করেছেন চলচ্চিত্রেও। সব মাধ্যমেই রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও তাঁর খ্যাতি প্রভূত। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযোদ্ধা।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘বই পড়া, নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়—আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখন ব্যস্ততার জন্য একটানা দীর্ঘক্ষণ পড়ি না, কিন্তু যখনই অবসর পাই বইয়ের সঙ্গে কাটাতে চাই। গাড়িতে বই থাকে, কোথাও যাওয়ার পথে বই খুলে বসি। রাত্রেও শোয়ার আগে কিছুক্ষণ পড়ার চেষ্টা করি। বিদেশে যখন যাই, সঙ্গে বই নিয়ে যাই। দূরের যাত্রায় প্লেনে সিনেমা দেখি, কিংবা বই পড়ি।’

বই পড়া প্রসঙ্গে নূর আরো বলেন, ‘লেখাপড়ায় যে খুব খারাপ ছিলাম তা নয়, কিন্তু পড়তে ইচ্ছা করত না, সেটা অবশ্যই ক্লাসের বই। আর সাহিত্যের বই? গোগ্রাসে গিলতাম। জীবনে অসংখ্যবার বই পড়ে খুব অনুপ্রাণিত হয়েছি। একটি চমৎকার বই আমাকে আন্দোলিত করে, তেমনই আবেগে আল্পুত করে একটি চমৎকার নাটক কিংবা চলচ্চিত্র।’

ছেলেবেলার স্মৃতিচারণা করে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘গল্পের বই পড়ার জন্য কত যে বকা খেয়েছি! আমার এক বন্ধু মুজাহিদ বিন খয়রাত। তাঁর বাবা ছিলেন যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী। ছোটবেলায় আমি আর মুজাহিদ প্রতিযোগিতা করে গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বই পড়তাম। আমরা দুজন প্রতিযোগিতা করে বইও কিনতাম। দুজনেই তাকিয়ে থাকতাম নীলফামারীতে কবে বই আসবে, কখন প্যাকেট খোলা হবে। বইয়ের প্যাকেট খোলা হলে কে কোন বই দখল করব, সেটা নিয়ে রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। অবশ্য এ প্রতিযোগিতায় দুজনেই লাভবান হতাম। কেননা আমরা দুজনই বই বিনিময় করে পড়তাম।’

স্মৃতির জানালা খুলে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বই পড়া প্রসঙ্গে মনে পড়ে বাবা-মার কথা। বাবা আবু নাজেম মোহাম্মদ আলী ও মা আমিনা বেগম আমাকে পড়ায় খুব উৎসাহ দিতেন। মা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সেই সূত্রে স্কুলের লাইব্রেরির অনেক বই পড়ার সুযোগ পেতাম। এ ছাড়াও বলতে হয় আমার এক বন্ধু ও চাচার কথা। তাঁর নাম মকসেদ। আত্মীয়তা দূরের, কিন্তু সম্পর্ক ছিল গভীর। স্কুলজীবনের শেষে, কলেজজীবনের প্রারম্ভে তাঁর কাছ থেকে বহু বই নিয়ে পড়েছি। অনেক বই পড়তেন তিনি। তাঁর কাছ থেকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, শংকর, জরাসন্ধসহ অনেক লেখকের বই নিয়ে পড়েছি। সে সময় দুটি বই আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। শংকরের ‘কত অজানারে’ ও ‘জরাসন্ধের লৌহকপাট’।

দেশ-বিদেশের ধ্রুপদি সাহিত্যের বই বেশি টানে নূরকে। বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের বহু রচনা অসংখ্যবার পড়েছি, উদ্দীপ্ত হয়েছি। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, নাটক, চলচ্চিত্র, রাজনীতি সম্পর্কিত বইও আমার পড়া হয় বেশি।’ প্রিয় বই, নাটক ও চলচ্চিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই সংখ্যা অনেক। কোনটা রেখে কোনটা বলব! ছেলেবেলায় পড়া একটি প্রিয় বই সম্পর্কে বলি। বইটির নাম ‘পথের পাঁচালী’। বইটি কতবার যে পড়েছি, আবেগে আন্দোলিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি তা বলার নয়। নীলফামারী শহরে রেললাইন ধরে দীর্ঘপথ হেঁটে গেছি বহুবার, রেললাইনের পাশে টেলিগ্রাফের খুঁটিতে কান চেপে ধরে আমি শুনতাম বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে অপুর দীর্ঘশ্বাস! ছেলেবেলার সেই দিনগুলো আজও মধুর অনুভূতি জাগায়।’

 



মন্তব্য