kalerkantho


ভালোবাসার দিনে রঙিন মেলাঙ্গন

পার্থ সারথি দাস   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভালোবাসার দিনে রঙিন মেলাঙ্গন

মেয়েটি চোখ মেলে তাকায়, কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। কারণ ওর দৃষ্টিশক্তি নেই। তবে বিশেষভাবে মুদ্রিত বইয়ে হাত বুলিয়ে তা পড়তে পারে। আর সেই আলোয় আলোকিত করতে চায় নিজের মনের ভেতরটা। ওর নাম বুলি। টিএসসি চত্বরের পাশ থেকে হাত ধরে বুলিকে নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢুকছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণী। বললেন, প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ারে বসিয়ে সেবাও দিচ্ছেন তাঁরা। কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে সেবা দেওয়ার মধ্যে ভালোবাসার রূপটা গভীরভাবে প্রকাশ পায়।

বিশ্ব ভালোবাস দিবস গতকাল বুধবার ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৪তম দিন। আগের দিনের পহেলা ফাল্গুনের রঙে রঙিন মেলা চত্বরে এদিন ছড়িয়ে পড়েছিল ভালোবাসার আগুন রং। ফাগুনের প্রথম দিনের বাসন্তী রঙের তুলনা করতে গিয়ে গতকাল বিকেলেও অনেকে বলছিলেন—ভালোবাসা দিবসে রঙের বাহারটা বুঝি কম থেকে গেল! তা নিয়ে কেউ কেউ আফসোসও করছিলেন। তবে তা স্থায়ী হয়নি। দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে শেষ বিকেলে। আগ মুহূর্তেই দেখা গেল—লালে লাল মেলাঙ্গন। মাথায় ফুলের টায়রা, মেয়েদের পরনে লাল শাড়ি আর ছেলেরা পরেছে পাঞ্জাবি। হাতে ভালোবাসার উপন্যাস বা কবিতার বই। ছোট ছোট মেয়েরা একেকজন যেন ছোট্ট লাল পরি। আর সেই পরিরা শুধুই ছুটছিল মেলা প্রাঙ্গণের এখানে-ওখানে।

বিকেল থেকে বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নে ক্রেতার ভিড় বাড়তে থাকে। একই সময়ে মঞ্চ ও আশপাশ কাঁপিয়ে নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে রঙে রঙিন তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। ঝিমিয়ে পড়া লিটল ম্যাগ চত্বর সন্ধ্যা থেকেই চঞ্চল হয়ে ওঠে। উপচে পড়া ভিড়ে চোখ রেখে তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক এ কে এম তারিকুল ইসলাম রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাঠকরা এখন বিষয়ভিত্তিক বই কিনছেন। সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা, গবেষণা—এসব বিষয়ভিত্তিক পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠছে। আজও ভিড় দেখছি। তবে মেলায় আজ অন্য রং।’

বিপ্লবীদের প্রিয় রং লাল। মেলাঙ্গনে বিপ্লবীদের কথা নামের স্টলে ছয়টি নতুন বই এসেছে এবার। সোমেন চন্দকে নিয়ে লিখেছেন হায়াৎ মামুদ। ৭১-এর তৃতীয় খণ্ডও এসেছে। বিক্রেতা লাবনী মণ্ডল বললেন, আজ লাল পেশাকের মানুষ বেশি। অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি দর্শনার্থী। সূর্যসেন ও প্রীতিলতার ওপর লেখা বইয়ের বিক্রি বেশ।

শিকড়ের স্টলে দেখা গেল ‘উড়ন্ত অভীপ্সা’ কবিতার বই। লিখেছেন তারনীমা ওয়ার্দা আন্দালিব। মূলত জীবনবোধের গভীরতা ও প্রেম নিয়ে লেখা এটি।

বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৯২টি। এবারের মেলায় এ নিয়ে মোট বই এসেছে এক হাজার ৯৩২টি। মেলাঙ্গন ঘুরে চারটি বইয়ের তথ্য তুলে ধরা হলো।

নির্মলেন্দু গুণ রচনাবলী : কবি নির্মলেন্দু গুণের রচনাবলী প্রকাশ করেছে কাকলী প্রকাশনী। মোট ৯টি খণ্ড বের হবে। এর মধ্যে এসেছে পাঁচটি খণ্ড। প্রতিটি খণ্ডের মূল্য এক হাজার টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু। আর তৃতীয় থেকে নবম খণ্ডের প্রচ্ছদ ধ্রুব এষের। ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ থেকে শুরু করে কবির সব রচনা একত্র করে বের করার প্রয়াস এটি।

পুঁজি (প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় পর্ব) : কার্ল মার্ক্সের ‘পুঁজি’ অনুবাদ করেছেন ড. আনোয়ার হোসেন। বইটি প্রকাশ করেছে রাবেয়া বুকস। মূল্য রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন মশিউর রহমান। বইটিতে কার্ল মার্ক্স তখনকার পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি তাদের শোষণের বিভিন্ন কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

বরীনভূমি বাদাবন : আবু বকর সিদ্দিকের গ্রন্থ এটি। এতে আছে ১২টি গল্প। বের করেছে বাংলা একাডেমি। মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আনওয়ার ফারুক। এতে স্থান পেয়েছে চর বিনাশকাল, খড়ার দুপুর, দোররা, বাইচ, বড় মিয়া, এক যে ছিল রাজাকার। অনুপম সুন্দর বর্ণনায় ফুটে উঠেছে প্রতিটি গল্প।

আফ্রিকার বিপন্ন জনপদ : পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওন ও আইভরি কোস্ট এবং মধ্য আফ্রিকার ডিআর কঙ্গো। সাধারণ, সহজ ও বিনোদন ভ্রমণের তালিকার বাইরে থাকা আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধে বিপন্ন এ তিন জনপদ ঘুরে আসার কাহিনি নিয়ে সাংবাদিক কাজী হাফিজের বই ‘আফ্রিকার বিপন্ন জনপদ’। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করেছে ‘অনিন্দ্য প্রকাশ’। মূল্য ২৫০ টাকা।

মূল মঞ্চের অনুষ্ঠান : বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘শিশু সংগঠন নিষ্ক্রিয়তা ও শিশুর সাংস্কৃতিক বিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহিত কামাল। আলোচনায় অংশ নেন সুব্রত বড়ুয়া, দিলারা হাফিজ ও হাসান শাহরিয়ার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্পী হাশেম খান। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী খুরশিদ আলম, মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ, কমলিকা চক্রবর্তী ও চম্পা বণিক। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ পাল (তবলা), বিলাস চন্দ্র বণিক (প্যাড), সুমন রেজা খান (কি-বোর্ড) ও শাহরাজ চৌধুরী (গিটার)।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে মূল মঞ্চে রয়েছে ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।


মন্তব্য