kalerkantho


প্রার্থীর জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বড় দুই দল

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রার্থীর জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বড় দুই দল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের তোড়জোড় ততই বাড়ছে। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে কোন্দল থাকায় প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে দুই দলের নেতাকর্মীরা।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলীয় শক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে লড়াই হতে পারে। অন্যদিকে বিএনপি আসনটি আবার দখরে নিতে চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বিভক্তি থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটি।

এ ছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের ১৫৪ নম্বর নির্বাচনী এলাকা নান্দাইলে এ পর্যন্ত ১০টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টি একবার জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে তিনটি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া নৌকা প্রতীকে, ১৯৮৮ সালে খুররম খান চৌধুরী জাতীয় পার্টি থেকে ও সর্বশেষ ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন বিনা ভোটে নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ : ২০১৪ সালের নভেম্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের কর্মিসভায় হামলার ঘটনায় শ্রমিক নেতা আবুল মনসুর ভূঁইয়া নিহত হন। তিনি দলের উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার বড় ভাই। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিনের সমর্থকদের। এ নিয়ে দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুস সালাম এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্বে আছেন সংসদ সদস্য তুহিন। উল্লেখ্য, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুস সালাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেও ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।

আগামী সংসদ নির্বাচনে নান্দাইল আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন—এমন অন্তত ১০ জন আলোচনায় আছেন। তাঁদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্য ছাড়াও আছেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক চৌধুরী স্বপন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আ্যাাডভোকেট আব্দুল হাই, অ্যাডভোকেট কবির উদ্দিন ভূঁইয়া, আওয়ামী পর্যটন লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি দাবিদার ড. আতিকুর রহমান খান ওরফে এ আর খান, ব্যবসায়ী এ ডি এম সালাহ উদ্দিন, জালাল উদ্দিন মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শাহাজাহান কবির সুমন।

বর্তমান সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিনের মা জাহানারা খানম ১৯৯৬ সালে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ছিলেন।

দলের নেতাকর্মীরা বলছে, গত চার বছরে আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন সংসদে নিয়মিত এলাকার নানা সমস্যা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছেন। এলাকার মানুষের সমস্যা জানার চেষ্টা এবং সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এ ছাড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার নারীদের বিভিন্নভাবে কর্মক্ষম করার জন্য উৎসাহ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি কেড়েছেন সংসদ সদস্য তুহিন। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।

আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন বলেন, একাদশ সংসদে যেতে পারলে তিনি তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে পারবেন।

মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুস সালাম ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত চার বছর তাঁর কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের সুসংগঠিত ও তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে কৌশলী ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিরোধিতা করেছে বর্তমান সংসদ সদস্যের। তাদের দাবি তৃণমূল আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই পক্ষ ত্যাগ করেননি। সবাই আব্দুস সালামের পক্ষে আছেন।

মনোনয়ন বিষয়ে বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সালামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আব্দুস সালাম সংসদ সদস্য না হওয়ায় জনগণ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গত চার বছর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার দাবি, আগামী নির্বাচনে আব্দুস সালাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন, এটা প্রায় নিশ্চিত।

নান্দাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক চৌধুরী স্বপন আসছে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়ন পরিষদের একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান স্বপন একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় বেশ পরিচিত। গত উপজেলা নির্বাচনে তিনি নিজের দল আওয়ামী লীগেরই শক্তিশালী প্রার্থীকে পরাজিত করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন।

আব্দুল মালেক চৌধুরী বলেন, ‘দলের বর্তমান দ্বিধাবিভক্তি বিবেচনা করলে আমিই একমাত্র যোগ্য প্রার্থী। আমাকে মনোনয়ন দিলে দল-মত-নির্বিশেষে সবাই আমার হয়ে কাজ করবে।’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুল হাই ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, তখন (২০০৮ সালে) আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁকে পরবর্তী সময়ে মনোনয়ন দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছেন।

ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন মাস্টারের বাড়ি নান্দাইলে। তিনি ব্যবসা করেন গাজীপুরে। তিনি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও নান্দাইল উপজেলা শাখার সদস্য। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তখন দল থেকে তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। এ অবস্থায় তিনি এবার মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

মো. মোস্তাফিজুর রহমান পেশাজীবী সংগঠন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, এলাকায় জনসংযোগ করছেন তিনি।

বিএনপি : নান্দাইল নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনবারের সংসদ সদস্য দলের ময়মনসিংহ উত্তর জেলা শাখার আহ্বায়ক খুররম খান চৌধুরী, সৌদি আরব বিএনপির (পূর্বাঞ্চল) সভাপতি এ কে এম রফিকুল ইসলাম, তাঁর ছোট ভাই পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ এফ এম আজিজুল ইসলাম পিকুল, লন্ডনপ্রবাসী সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল  হোসেন খান চৌধুরীর ছেলে ইয়াসের খান চৌধুরী ও মালয়েশিয়া বিএনপির প্রকাশনা সম্পাদক মামুন বিন আব্দুল মান্নান।

খুররম খান চৌধুরী বলেন, নান্দাইলের দৃশ্যমান উন্নয়ন তাঁর আমলেই শুরু হয়েছিল। দল-মত-নির্বিশেষে তিনি জনগণের প্রিয় বন্ধু। তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। এমন কোনো এলাকা নেই যে তাঁর হাতের ছোঁয়া লাগেনি। তিনি বিএনপি থেকে এবার মনোনয়ন পাবেন—এটা প্রায় নিশ্চিত।

প্রবাসী রফিকুল ইসলাম একজন দানবীর হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনিও মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁর ভাই সাবেক মেয়র আজিজুল ইসলাম পিকুল এলাকায় থেকে দলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। আজিজুল ইসলাম বলেন, তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।

মালয়েশিয়া বিএনপির প্রকাশনা সম্পাদক মামুন বিন আব্দুল মান্নান নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। তিনি প্রায়ই এলাকায় আসেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও দুস্থদের সহায়তা করাসহ বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।

মান্নান বলেন, ‘নান্দাইলের মানুষ নতুন কাউকে এ আসনে দেখতে চায়। আমি এই যোগ্যতার দাবিদার হয়ে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। নির্বাচিত হয়ে নান্দাইলের জন্য কিছু করতে চাই।’

অন্যান্য দল : নান্দাইলে একসময় জাতীয় পার্টি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন দলটির কার্যক্রম আগের মতো নেই। তবে সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম ভূঁইয়া দলকে সংগঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দুই বছর আগে তিনি মারা যাওয়ার পর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। এ অবস্থায় তাঁর বড় ছেলে হাসনাত মাহমুদ তালহা দলের হাল ধরেছেন। দলের আর কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী না থাকায় তিনিই জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পাবেন, এটা এক রকম নিশ্চিত।

অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে নান্দাইলে জাসদ বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দলের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিনের বাড়ি এখানে। তিনি জোটগতভাবে নির্বাচন করতে মাঠে নেমেছেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে নান্দাইলে এনে বিশাল জনসভা করেছেন। ওই সভায় আগামী নির্বাচনে ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নান্দাইলে আওয়ামী লীগের কোন্দল সম্পর্কে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবগত আছেন। এ অবস্থায় আমাকে জোটগতভাবে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগে কোন্দলের অবসান হবে। সেই সঙ্গে এ আসনটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়া যাবে।’

পৌরসভা শাখা জাসদের সভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন একজন সজ্জন ব্যক্তি। তিনি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। তিনি এমপি হলে জনগণ তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছুই পাবে।’

 

 


মন্তব্য