kalerkantho


ফাগুনে এলো পূর্ণতা

পার্থ সারথি দাস   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ফাগুনে এলো পূর্ণতা

ফাল্গুনের প্রথম দিনে বসন্তবরণে হাজারো প্রাণের কল্লোলে নগর মুখর হয়েছে সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির জয়গানে। বাসন্তীরাঙা বসন আর ফুলের শোভায় সেজে মানুষ ছুটেছে উৎসবের আঙিনায়। ফাল্গুনের প্রথম দিনে বসন্তের দোলা সবার হৃদয়ে। তবে দিনটি যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মিলিত হয়ে। বাংলা একাডেমি চত্বর ও লাগোয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলমান বইমেলাও গতকাল মঙ্গলবার ১৩তম দিনে এসে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরেছে নিজেকে। আজ বুধবার আরেকটি বিশেষ দিন—বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। মেলায় আজও থাকবে এমনই উৎসবের রং।

বরাবরের নিয়ম ধরে গতকালও একুশে গ্রন্থমেলার দরজা খুলেছে বিকেল ৩টায়। আর বসন্তের রঙে রঙিন পাঠক-দর্শকরাও যেন ছিল এর প্রতীক্ষায়। তারা সারি বেঁধে প্রবেশ করতে শুরু করে মেলা প্রাঙ্গণে। বিকেলে শাহবাগ থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে মেলাঙ্গনে ঢোকার পথটুকু চলতে হয়েছে সন্তর্পণে। সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলা বা আশপাশের বা অন্য কোনো স্থানের ‘ম্যালা’ মানুষের ভিড় গিয়ে যোগ হতে থাকে গ্রন্থমেলার বিভিন্ন প্রান্তে। মুহূর্তেই সরগরম হয়ে ওঠে বইমেলা। চারদিকে যেন ছড়িয়ে পড়তে থাকে রঙের মাধুরী।

বইমেলায় গতকাল স্টলে স্টলে ছিল ব্যাপক ভিড়। আর তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়। যতক্ষণ মেলার দরজা খোলা থেকেছে, ভিড়ের খুব একটা রকমফের হয়নি। এদিন কবিতার বইয়ের জন্য বাড়তি একটা আগ্রহ বরাবরের। তবে গতকাল নতুন উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের খোঁজে প্রেমিক-প্রেমিকার ভিড় ছিল বিভিন্ন স্টলে, প্যাভিলিয়নে। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘রচনা সমগ্র’ এনেছে কাকলী প্রকাশনী। কবির বহু ভক্ত গতকাল এই প্রকাশনীতে ভিড় করেন। তবে তিনি ছিলেন না। কালের কণ্ঠকে কবি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশেই কবিতার পাঠক কমেছে। তবে আমাদের এখানে কবিতার প্রতি ভালোবাসা কমেনি। আজও উপজেলা পর্যায়েও কবিতার আবৃত্তি না হলে যেন অনুষ্ঠান পূর্ণতা পায় না। আবৃত্তিচর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। অপশক্তি কবিতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে।’

কাকলী প্রকাশনীর প্রকাশক নাসির আহমেদ সেলিম বললেন, ষাটের দশকে বা উত্তাল সময়ে কবিতা ছিল অনিবার্য। এখনো কবিতার বই বের হয়। তবে চাহিদাটা যেন আগের মাত্রা ধরে রাখতে পারছে না। এর চেয়ে বেশি চাহিদা উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, গল্পগ্রন্থের।

জাগৃতি প্রকাশনীর সামনে ‘দীপন চত্বর’। সেখানে বিকেল থেকেই তরুণ-তরুণীর ভিড় যেন উপচে পড়ছিল। জাগৃতির বিক্রেতা আল মামুন বলেন, দুটি কবিতার বই এসেছে ফাগুনের দিনে। তার একটি দেলোয়ার মজুমদারের ‘জোছনা রঙে আঁকা’ কিনতে আসা রাখী রহমান বলেন, নবীনদের বইও তো কিনতে হবে।

সন্ধ্যায় মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের সামনে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, তথ্যকেন্দ্রে নাট্যজন ইনামুল হক, তারও আগে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ফাগুনের দিনে তাঁদের উপস্থিতি মেলাকে বাড়তি মাত্রায় উজ্জীবিত করেছে।

বসন্তের প্রথম দিন গতকাল কবিতাসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন বই মেলায় এসেছে। মেলায় প্রকাশিত চারটি বইয়ের তথ্য পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

আত্মস্মৃতিতে পূর্ববঙ্গ : মুনতাসীর মামুনের বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। লেখক চার দশক ধরে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন অভিন্ন বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে। খণ্ডে খণ্ডে পূর্ববঙ্গবিষয়ক আত্মস্মৃতি সংকলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ এটি। গ্রন্থটির সংকলক ও সম্পাদক তিনি নিজে। এখানে মানকুমারী বসু, আমোদিনী দাশগুপ্ত, বঙ্গচন্দ্র রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের স্মৃতিকাহিনি স্থান পেয়েছে। গবেষক মনে করেছেন, আত্মস্মৃতি ইতিহাস রচনায় বড় সহায়ক। উনিশ শতকে সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে পূর্ববঙ্গের উপস্থিতির অভাব থেকেই গবেষক মুনতাসীর মামুনের এই প্রয়াস। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন মামুন কায়সার।

বিজ্ঞানী লীরা ও এলিয়েন : এটি একটি সায়েন্স ফিকশন। লিখেছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। বইটি বের করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড। শিশু-কিশোর এমনকি বড়দের কাছেও সমান জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক লীরাকে ঘিরেই টান টান উত্তেজনা আর রহস্যের আবরণে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সায়েন্স ফিকশন। লীরা এক অন্য গ্রহের মানুষ। এই লীরাকে ঘিরেই টান টান উত্তেজনা আর রহস্যের আবরণে মোড়ানো বইটির ঘটনাপ্রবাহ। ঝরঝরে ভাষায় লেখক তা তুলে ধরেছেন অসাধারণ এক মুনশিয়ানায়। বইটির নজরকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। মূল্য রাখা হয়েছে ১৮০ টাকা। তবে কমিশনে এটি কেনা যাবে।

শ্রডিঙ্গারের জেব্রা : লিখেছেন আহসান হাবীব। বইটি বের করেছে শিকড় প্রকাশনী। এটি একটি রম্য গ্রন্থ। সিচুয়েশনাল কমেডি থেকে বিজ্ঞান রম্য, রম্য গল্পও আছে। সবার হাসা উচিত। লেখক মনে করেন, যে দিনটি হাসা গেল না সে দিনটি দারুণভাবে ব্যর্থ। এই গ্রন্থপাঠে পাঠক না হেসে পারবেন না। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ২০০ টাকা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আহসান হাবীব নিজেই।

শাহ আবদুল করিম : উৎস প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। গণমানুষের গান গেয়ে ও রচনা করে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম। এটি শাহ আবদুল করিমের ওপর বিশিষ্টজনদের মূল্যায়নের একটি গ্রন্থ। সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন বাউল করিমের ঘনিষ্ঠজন শুভেন্দু ইমাম। এতে রয়েছে আবুল আহসান চৌধুরী, সুধীর চক্রবর্তী, মৌসুমী ভৌমিকসহ ১৩ জনের লেখা। আছে চারটি বিশেষ সাক্ষাৎকার। দাম রাখা হয়েছে ২৭৫ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।

নতুন বই : গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫০টি। এর মধ্যে কবিতার ৫৭টি, উপন্যাসের ২৭, গল্পের ১৬, প্রবন্ধের ৫, গবেষণাবিষয়ক ৩, শিশুসাহিত্য ৩, জীবনী ৬, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৩, রাজনীতি ৩, স্বাস্থ্যবিষয়ক এক, অনুবাদ ৩, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ৩, বিজ্ঞানবিষয়ক ৪, সায়েন্স ফিকশন ১ ও অন্যান্য ১৭টি বই রয়েছে। বিকেলে মূলমঞ্চে ছিল ‘নারীর নিরাপদ পরিসর ও পরিবেশ শীর্ষক’ আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুশী কবির। আলোচনা করেন সুলতানা কামাল, হোসনে আরা শাহেদ, সুভাষ সিংহ রায় ও নূরুন্নাহার মুক্তা। সভাপতিত্ব করেন আয়শা খানম। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘শিশু সংগঠন নিষ্ক্রিয়তা ও শিশুর সাংস্কৃতিক বিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।



মন্তব্য