kalerkantho


বাংলাদেশ নিয়ে বিবিসির নিবন্ধ

দুই নেত্রীর লড়াইয়ে দেশের মানুষ ক্লান্ত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুই নেত্রীর লড়াইয়ে দেশের মানুষ ক্লান্ত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই নারীর লড়াইয়ে দেশের মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছে বিবিসি। গতকাল রবিবার বিবিসি অনলাইনের ফিচার বিভাগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই দাবি করেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যটির দক্ষিণ এশিয়া করেসপনডেন্ট জাস্টিন রৌউলাট। নিবন্ধটিতে বিরোধী দল দমনে সরকারের প্রতি তীব্র সমালোচনা উঠে এসেছে।

নিবন্ধটিতে বিবিসি প্রতিনিধি রৌলাট বলেছেন, বিএনপির বিগত সাধারণ নির্বাচন বর্জন করার অন্যতম কারণ ছিল খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এতিম তহবিলের অপব্যবহারে সরকারের মামলা দায়ের করা। সেই মামলায়ই গত সপ্তাহে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের জেল হয়েছে।

নিবন্ধে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে চলা সমীহা জাগানো দুই ভদ্রমহিলার মধ্যে যে লড়াই চলে আসছে, সম্প্রতি বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার সাজা সেই লড়াইয়ের সর্বশেষ চাল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার মধ্যে তিক্ত শত্রুতা দেশকে সহিংসতার পাঁকে ফেলে দিয়েছে। ফলে বাসে বোমা, নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা নির্মমভাবে নিয়মিতভাবে দেখা যায়।

তবে তাঁদের সম্পর্ক সব সময়ই এমন শত্রুতাপূর্ণ ছিল এমন নয়। আশির দশকে তাঁরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলন করেছেন এবং একনায়ক এরশাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছেন। দুই নারীরই রাজনীতিতে আসা পরিবারতান্ত্রিকভাবে।

এরশাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর ১৯৯০ সাল থেকে দুজনই পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করে এসেছেন। তবে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ শীর্ষে রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে তিনি ধূর্ততার সঙ্গে পরাজিত করেছেন এবং নির্মমভাবে ক্ষমতা সুরক্ষিত করেছেন। শেখ হাসিনা সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন উন্মুক্ত ভোটাভুটিতে। বিএনপি ওই নির্বাচন বয়কট করায় তাঁর সমর্থকরা ব্যালট বাক্স পূর্ণ করেছে। এর ফলে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।

এ বিষয়ে বিবিসি প্রতিনিধি রৌলাট বাংলাদেশের এক প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন ছেড়ে দিলেও অন্য কোনো প্রার্থী কি দাঁড়াতে চাননি?’ জবাবে ওই পর্যবেক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁরা শুধু প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার অপেক্ষায়ই ছিলেন। অথবা হতে পারেন এ জন্য তাঁদের প্ররোচিত করা হয়েছিল। রৌলাটের দাবি, এই ‘প্ররোচনাই’ বাংলাদেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য।

নিবন্ধ বলা হয়, সর্বশেষ নির্বাচনে শেখ হাসিনা জয়লাভ করে বিএনপি নেতাদের নির্যাতন করেন এবং তার প্রধান অংশীদার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেন। আর গত সপ্তাহে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজাও আগামী নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে পারে। এটা হলে শেখ হাসিনা (বিবিসির ভাষায়) ‘টানা’ চতুর্থবারের মতো জয় পাবেন। কারণ বাংলাদেশি আইনে দুই বছরের বেশি কেউ সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না। যদি খালেদা জিয়া আশা করছেন যে তিনি আপিল করবেন এবং এ মামলা ঝুলে থাকবে বিধায় তিনি নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন। রায়ের আগের দিন তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এবার ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেওয়া হবে না’। তবে খালেদা জিয়ার এটাও জানা যে তাঁর মাথার ওপর আরো ৩০টি মামলা ঝুলছে।

গত মাসেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গণগ্রেপ্তার থেকে বিরত থাকতে শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী খালেদা জিয়ার সমর্থকদের ওপর লাঠিপেটা করেছে, টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেছে।

নিবন্ধে বলা হয়, এই অবস্থায় বাংলাদেশে রাস্তার পাশে যেকোনো চায়ের দোকানে দুই নেত্রীর এই লড়াইয়ের কথা উঠে আসে। একই সঙ্গে জনগণের বেদনার অনুভূতিও উঠে আসে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশিরা দুই নারীর ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তারা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি দুই নারীকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে সরাতে পারবে না। তাদের দুজনের বয়স এখন ৭০-এর ঘরে হলেও তাঁরা তাঁদের লড়াই বন্ধ করতে নারাজ। রৌলাট বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাষ্যকার বলতেই পারেন বাংলাদেশে দ্বিদলীয় রাজনীতি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। তবে খালেদা জিয়া শেষ হয়ে যেতে রাজি নন। গত বৃহস্পতিবার তিনি আদালত ছাড়ার আগে বলেছেন, ‘আমি ফিরে আসব। কান্নাকাটির কিছু নেই।’


মন্তব্য