kalerkantho


বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত বই

পার্থ সারথি দাস   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত বই

সোনারোদে চিকচিক করছিল বাংলা একাডেমি চত্বর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের স্টলে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছিলেন নুরুল ইসলাম। অন্তর্জালে গ্রন্থটির ৭৫ শতাংশ পাঠ করেছিলেন, তৃষ্ণা মেটেনি। হাতে পেতে চান ঝকঝকে ছাপা নতুন বই। গন্ধটাও যে তার অন্য রকম!

বাংলাদেশ বিমানের জুনিয়র অপারেশন অফিসার নুরুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার দুপুরে কর্মস্থল থেকে ছুটে যান অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাপা বই হাতে নিয়ে পড়ার আনন্দটাই আলাদা। অনুভূতিটা বলে বোঝানো মুশকিল।’

স্টলের বিক্রেতা মো. নেসার জানান, গতকাল তিন ঘণ্টায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ১০০ কপি বিক্রি হয়ে গেছে। একই স্টলে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’ একই সময়ের মধ্যে বিক্রি হয় ৬৫ কপি।

গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে ছুটে আসা তরুণ আল আমীন ‘কারাগারের রোজনামচা’ কিনে বলেন, ‘অনেক খুঁজেছি, শেষ পর্যন্ত পেলাম।’ এই গ্রন্থমেলা উপলক্ষে নয়, আগেই প্রকাশ হয়েছিল; তবু বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে একের পর এক বই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এভাবেই বিক্রি হচ্ছে। পাঠকের মন কেড়ে নিচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা নতুন বইও।

রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ মার্চ চারদিক কাঁপিয়ে বজ্রকণ্ঠে শুনিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমোঘ মন্ত্র। ওই সময়ের রেসকোর্স ময়দান আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সেই উদ্যানেই পার্ল পাবলিকেশন্সের স্টলে থরে থরে সাজানো বইয়ের মধ্যে নজর কাড়ে বিশিষ্ট কথাশিল্পী মোস্তফা কামালের ‘অগ্নিপুরুষ’। ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস অগ্নিকন্যা’র দ্বিতীয় পর্ব ‘অগ্নিপুরুষ’-এ শেখ মুজিবুর রহমান যেন পাঠকের সামনেই উপস্থিত হন ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের আগুন সময়ের নেতা হিসেবে।

গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কমপক্ষে এক হাজার ৩০০ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল মেলার বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশনায় চোখ পড়ে পাঠকদের। বাংলা একাডেমির ছয়টি কাউন্টারের একটি নজরুল মঞ্চের কাছে। সেখানে দুপুর পর্যন্ত ‘কারাগারের রোজনামচা’ ৩০ কপি বিক্রি হয়ে যায়। এ মাসে বের হওয়া শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ কিনতে ক্রেতার ভিড় ছিল। একাডেমির ইমরুল ইউসুফ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মৌলিক প্রকাশনায় পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে। শ্রাবণের স্টলে গিয়ে জাহিদ নেওয়াজ খানের ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ নিয়ে পাঠকের আগ্রহ আছে তা জানা গেল। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সে এ এ বি এম নুরুল হকের ‘বজ্রকণ্ঠ ও স্বাধীনতা’ গ্রন্থটি কিনতে আসা শরীফ হোসেন বলেন, এটি ৭ই মার্চের ভাষণের ভিন্নমাত্রার মূল্যায়ন। কথাপ্রকাশের স্টলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প ‘জনকের মুখ’ শোভা পাচ্ছিল। আখতার হোসেনের সম্পাদনায় বের হওয়া বইটি চার শতাধিক পৃষ্ঠার।

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়ের চারটি বইয়ের তথ্য পরিচিতি তুলে ধরা হলো। আশা করা যায়, এতে পাঠক-ক্রেতা ও লেখক-প্রকাশকরা উপকৃত হবেন।

স্মৃতিময় কর্মজীবন : বইটির লেখক আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রকাশ করেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি। বইয়ে ঘটনাধারার সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা উঠে এসেছে সাবলীলভাবে। আর লেখক তা তুলে ধরেছেন নিজ কর্মজীবনের স্মৃতির উঠান থেকেই। মুহিত প্রায় ৬০ বছরের দীর্ঘ কর্মময় জীবনে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ভরেছেন জীবনের ঝুলিতে। লেখকের কর্মজীবনের স্মৃতির ফাঁকে উঠে এসেছে ইতিহাস, সত্য। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। মূল্য ৬০০ টাকা।

রাই কুড়িয়ে বেল : বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের গ্রন্থ। বের করেছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ। মোট আটটি গল্প স্থান পেয়েছে বইটিতে। একেকটি গল্প একেক রকম। সব মিলিয়ে পাঠকের মন ভরে দেবে কাহিনি, কথা ও বর্ণনা। দেওয়ান আতিকুর রহমানের আঁকা প্রচ্ছদের বইটির মূল্য ২০০ টাকা।

ত্রাতিনা : জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের বইটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। বইয়ের পরতে পরতে আছে রহস্য। কাহিনির একটি অসাধারণ চরিত্র ত্রাতিনা। সে একবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে আমি কোথায়? তার কণ্ঠস্বর দূরে মিলিয়ে যায়। প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে : আমি কোথায়...আমি কোথায়...আমি কোথায়...। এভাবে রহস্যের বর্ণনায় এগিয়ে চলে কাহিনি। বইটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ।

ভূমিরেখা : পার্ল পাবলিকেশনস থেকে বের হয়েছে। লেখক দীপু মাহমুদ। দেশহীন মানুষের কাহিনি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসের কাহিনি। তীব্র দেশপ্রেম আর ভালোবাসা সেখানে পাঠককে স্পর্শ করে। মূল্য ২৫০ টাকা।

উচ্ছ্বাসভরা তৃতীয় শিশু প্রহর : ছুটির দিন হওয়ায় গতকাল সকাল থেকেই বইপ্রেমীরা মেলাঙ্গনে যেতে থাকেন। সন্ধ্যার আগেই বাঁধ ভাঙে ভিড়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এবারের আয়োজনের তৃতীয় শিশুপ্রহর ছিল কলকাকলিতে প্রাণময়। সিসিমপুরের আয়োজনে মঞ্চে হালুম, ইকরি, শিকু ও টুকটুকির উপস্থিতির পর শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধভাঙা।

কমিকস, তথ্যভিত্তিক ও গল্পের বই বিক্রি হয়েছে ভালোই। মেলা প্রকাশনীর কর্মকর্তা ফারহান শাহরিয়ারের পর্যবেক্ষণ হলো, শিশুরা বই দেখতেই বেশি পছন্দ করে। শিশুবেলা প্রকাশনীর বিক্রয় কর্মকর্তা ইমরান হাসান জানান, বইয়ের বিক্রিও ছিল তুলনামূলক বেশ ভালো। বাংলা একাডেমির আয়োজনে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ৬৮৭ জন শিশু-কিশোর।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ ও সমন্বয় উপবিভাগের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় এসেছে ৩৪৪টি নতুন বই। এর মধ্যে গল্প ৫৬, উপন্যাস ৬৭, প্রবন্ধ ১৯, কবিতা ৯৫, গবেষণা ৬, ছড়া ১৪, শিশুতোষ ১৫, জীবনী ৬, রচনাবলি ২, মুক্তিযুদ্ধ ৬, নাটক ৩, বিজ্ঞান ২, ভ্রমণ ৬, ইতিহাস ১২, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ৩, রম্য ১, ধর্মীয় ২, অনুবাদ ২, অভিধান ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ৫ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ২১টি বই রয়েছে।

নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘অগ্রগতির শর্তপূরণ’ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘অনলাইন জীবন ও অন্যান্য’ (বিদ্যাপ্রকাশ), আনিসুল হকের ‘দেশ সেরা দশ গোয়েন্দা’ (কাকলী), সেলিনা হোসেনের ‘পদশব্দ’ (এশিয়া পাবলিকেশন্স), ওমর ফারুকের ‘বাবার চোখ’ (অ্যাডর্ন), ফিরোজ এহতেশামের ‘সাধুকথা : ১৩ বাউল-ফকিরের সাথে কথাবার্তা’ (মেঘ), অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর ‘ক্যান্সার’ (মুক্তধারা), কায়কোবাদ মিলনের ‘মোসাদ ২’, জাহিদ নেওয়াজ খানের ‘মূর্তি কারিগর’ ও আনিসুজ্জামানের ‘দুইটি নাটক’ (আবিষ্কার); আহমদ রফিকের ‘জীবনানন্দ : কবি, প্রেমিক ও গৃহী’ ও সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার ‘গণমাধ্যমের লড়াই’ (অন্যপ্রকাশ), সুমন্ত আসলামের ‘মুখোশধারী ভয়ংকর’ (কাকলী), হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’ (পাঠক সমাবেশ)।

আজকের আয়োজন : আজ শনিবার মেলার দ্বার খুলবে সকাল ১১টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশু প্রহর।


মন্তব্য