kalerkantho


‘মনোনয়ন লড়াই’ আ. লীগে বিএনপিতে শুধু দুই ভাই

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ    

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘মনোনয়ন লড়াই’ আ. লীগে বিএনপিতে শুধু দুই ভাই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) সংসদীয় আসনে প্রধান তিনটি দল থেকেই আগ্রহী ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে নেমেছেন। তাঁরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। সমাদর করছেন কর্মী-সমর্থকদের। মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রেও যোগাযোগ রাখছেন।

জাতীয় সংসদের ১৫০ নম্বর নির্বাচনী এলাকা মুক্তাগাছায় আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী। বিএনপিতে আলোচনায় আছেন শুধু দুই ভাই। আর জাতীয় পার্টিতে একজনই আছেন।

এ আসনে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ নাকি জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্বাচন করবেন, তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও অস্পষ্টতা আছে। মনোনয়নে আগ্রহী বিএনপি নেতা দুই ভাইয়ের বিভক্তির ছায়া দলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যেও আছে।

মুক্তাগাছা আসনে একাধিকবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিজয়ী হন। বর্তমানে এ আসনে সংসদ সদস্য হলেন জাতীয় পার্টির সালাহউদ্দিন আহমেদ মুক্তি। কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ‘ছেড়ে’ দিয়েছিল। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি আসনটি দাবি করবে। জনসংযোগেও আছেন দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ চাইছে এ আসনে আবার দলীয় প্রার্থী দিতে। জোট হলেও আসনটিতে যেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীই নির্বাচন করেন সেটাই চাচ্ছে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ : এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন দলের সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তাগাছা শাখার সভাপতি কে এম খালিদ বাবু। এ ছাড়া আলোচনা ও ভোটারদের মাঝে কমবেশি জনসংযোগে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুক্তাগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বদর উদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল হাই আকন্দ, দলের জেলা শাখার সাবেক তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আহসান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত শামছুল হকের ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শাতিল মো. তারেক, কৃষিবিদ ড. নজরুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুর সহধর্মিণী সেলিমা সোবহান খসরু প্রমুখ।

আলোচিত ও আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে আছেন কে এম খালিদ বাবু। ময়মনসিংহের স্বনামধন্য রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তিনি। জেলার আওয়ামী রাজনীতিতেও তিনি পরিচিত মুখ। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ আমলে দলের দুঃসময়ে দলের হয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ ও জেলা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে খালিদ বাবুর পরিবারের সুনাম আছে। মুক্তাগাছার সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি চেষ্টা করেছেন এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে। চেষ্টা করেছেন নিজের ও দলের সুনাম ধরে রেখে দলকে সংগঠিত করতে। ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সর্বমহলে খালিদ বাবু সমাদৃত। তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলে এ আসন আবারও আওয়ামী লীগের ঘরে যাবে বলে দলীয় কর্মী-সমর্থকরা বিশ্বাস করে।

মুক্তাগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তাগাছার মানুষদের এখন একটাই চাওয়া, তা হলো খালিদ বাবুর দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তি এবং এ আসনে ওনার প্রার্থী হওয়া। উনি (খালিদ বাবু) প্রার্থী হলে আবারও বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।’

খালিদ বাবু বলেন, ‘এমপি থাকাকালীন মুক্তাগাছার জনগণের পাশে ছিলাম, এখনো আছি। এলাকার সার্বিক উন্নয়ন করেছি। দলকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করেছি। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিলে আসনটি অবশ্যই উপহার দিতে পারব।’ তবে তিনি এও বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত দেবে, তিনি তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন।

দলের মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল হাই আকন্দ।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুক্তাগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বদর উদ্দিন আহম্মেদও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। ভোটের মাঠে তিনিও একজন আলোচিত সম্ভাব্য প্রার্থী।

বদর উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘সব সময় দলের জন্য নিবেদিত ছিলাম। এখনো আছি। ভবিষ্যতেও থাকব। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছি।’

মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ছাত্রনেতা আহসান মোহাম্মদ আজাদ। এলাকায় পরিচিত মানুষ তিনিও।

সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুর সহধর্মিণী সেলিমা সোবহান খসরুও এলাকায় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

এ ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শাতিল মো. তারেক। তিনি বলেন, ‘জনসংযোগে আছি। এ আসনের ভোটাররা আমাকে চেনেন। আমার বাবাকে চিনতেন। মনোনয়ন পেলে বিজয়ী হব।’

কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম উপজেলার মোড়ে মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়ে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে জনসংযোগ করছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

বিএনপি : রাজনৈতিকভাবে অনেকটা নীরব থাকলেও একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্থানীয় বিএনপি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু দলীয় সমর্থক ভোটার ও কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলের আগ্রহী দুই প্রার্থীকে নিয়ে। আলোচিত এ দুই প্রার্থী হলেন সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, আরেকজন হলেন তাঁরই ভাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন বাবলু।

এ আসনটি দীর্ঘদিন ছিল বিএনপির দখলে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোশাররফ হোসেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ-৪ সদর আসন থেকে প্রার্থী হয়ে হেরে যান। এবার তিনি আবার ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনে ফিরে যেতে চান। মুক্তাগাছার সর্বস্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এলাকার সংসদ সদস্য থাকাকালে মোশাররফ হোসেনের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার কথা এখনো মানুষ মনে করে। নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনায় জানিয়েছেন, তিনি মুক্তাগাছার মানুষ। এখানকার মানুষ তাঁকে ভালোবাসে। তাই তিনি জীবনে শেষবারের মতো ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে আসনটি উপহার দিতে চান।

অন্যদিকে ২০০৮ সালে মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই জাকির হোসেন বাবলু বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খালিদ বাবুর কাছে পরাজিত হন। তিনিও আবার দলের প্রার্থী হতে চান।

জাকির হোসেন বাবলু বলেন, ‘আগেও এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছি। এবারও পাব বলে আশা করি।’ ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো বিরোধ নাই। দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর পক্ষেই কাজ করব।’

জাতীয় পার্টি : জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ মুক্তি। তিনি গত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের মতো রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাঁর আগমন হঠাৎ করেই। তাঁকে নিয়ে এলাকায় নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে নিশ্চিত মনোনয়ন চাইবেন। তবে এবার সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে এ আসনে তাঁর জয় কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিএনপি নির্বাচনে এলে নির্বাচনী খেলায় নেমে তিনি কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন এ নিয়ে ভোটারদের মাঝে প্রশ্ন আছে।

বক্তব্য নেওয়ার জন্য সালাহউদ্দিন আহমেদ মুক্তিকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে তিনি একাধিক সময়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকারের মেয়াদে গত চার বছরে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণসহ মুক্তাগাছায় তিনি অনেক উন্নয়ন করেছেন। আগামী দিনেও তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং ওই নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন।


মন্তব্য