kalerkantho


ইংরেজির ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ তিন জেলায় গ্রেপ্তার ৫

আজ ধর্ম পরীক্ষা, থেমে নেই ‘বাণিজ্য’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইংরেজির ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ তিন জেলায় গ্রেপ্তার ৫

প্রতীকী ছবি

এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ফাঁসকারী এক তরুণকে মাদারীপুরে বাসে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বগুড়ায় পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে এক মাদরাসা শিক্ষকের মোবাইলে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের কপি পেয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজবাড়ীতেও মোবাইলে প্রশ্নপত্র পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। আগের তিনটি পরীক্ষার মতো গতকালও পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। আজ ইসলাম ধর্ম পরীক্ষা। গতকাল থেকে এ বিষয়েরও প্রশ্নপত্র বিক্রি চলছিল ফেসবুকে।

মাদারীপুরে ধরা পড়া তরুণটি নিজের নাম বলেছে জুবায়দুল ইসলাম মিঠু। সে নিজেকে  রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বরগুনার আমতলী উপজেলার সবুজবাগ এলাকার আব্দুস সাত্তার চোকদারের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। মিঠুকে যাত্রীবাহী বাস থেকে ধরিয়ে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব এনজিও কর্মকর্তা জন লিটন বৈরাগীর। ফোনে যোগাযোগ করা হলে লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে  ঢাকা থেকে কুয়াকাটাগামী ঈগল পরিবহনের বাসে ওঠেন ফরিদপুর থেকে, লক্ষ্য ছিল ভাঙ্গায় নেমে যাওয়ার। দরজার পাশে এ২ নম্বর সিটে বসার কিছুক্ষণ পরই তিনি খেয়াল করেন, পাশে এ১ নম্বর সিটে বসা তরুণটি মোবাইল ফোনে ত্রস্ততার সঙ্গে কিছু চালাচালি করছে। ৯টার কিছুক্ষণ পর ছেলেটির কাছে একের পর এক ফোন আসা শুরু হয়। তরুণটির মুখে ‘কোয়েশ্চেন’, ‘ইংলিশ সেকেন্ড পেপার’, ‘কমন পড়া’, ‘প্রশ্নের দাম’—এসব শুনে লিটন বুঝে যান ছেলেটি প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের সদস্য। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে অভিযুক্ত করেন। ছেলেটি তখন ক্ষমা চেয়ে বলে আর সে এ কাজ করবে না।

লিটন বৈরাগী কালের কণ্ঠকে জানান, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী শাম্মি আখতারের ফোন নম্বর সঙ্গে থাকায় তিনি তাঁকে ফোন। শাম্মি জানান, তিনি বদলি হয়ে গেছেন এবং তিনি বর্তমান ইউএনওর নম্বর দেন। লিটনের ফোন পেয়ে কালকিনির ইউএনও জেলা প্রশাসকের নম্বর দেন। লিটন ফোনে খবরটি দিলে জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম নির্দেশনা দেন ছেলেটিকে আটকে রেখে মস্তফাপুরে বাস থামাতে। লিটন বাসের চালক, সুপারভাইজার ও যাত্রীদের সহায়তায় ছেলেটিকে আটকে রাখেন। বাসের দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। মস্তফাপুরে পৌঁছার পর সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসক নিজে পুলিশ দিয়ে ছেলেটিকে আটক করান। আটকের সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সৈয়দ ফারুক আহম্মদ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল মামুন উপস্থিত ছিলেন। পরে জেলা প্রশাসনের তরফে সদর থানায় মামলা হয় এবং মিঠুকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

লিটন কালের কণ্ঠকে জানান, ডিসি তল্লাশি করে ছেলেটির মোবাইল ফোনে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ও উত্তরের কপি পেয়েছেন। জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেছেন, আটক তরুণের মোবাইল ফোনে পাওয়া প্রশ্নের সঙ্গে হলে বিতরণ করা প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

এদিকে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম রেজা জানিয়েছেন, গতকাল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা শুরুর আধাঘণ্টা আগে উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের জঙ্গল গ্রামের সুকুমার বিশ্বাসের ছেলে সুব্রত বিশ্বাস (২৪), গঙ্গাসাগর গ্রামের ক্ষিরোদ ঘোষের ছেলে সজিব ঘোষ (১৯) ও বালিয়াকান্দি গ্রামের বাবলু মোল্যার ছেলে সুমন মোল্যাকে (২০) মোবাইল ফোনসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ফোনে  ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রসহ আগের বিষয়ের প্রশ্নপত্রও উত্তরসহ পাওয়া গেছে। তারা দোষ স্বীকার করায় পাবলিক পরীক্ষাসমূহ অপরাধ আইন, ১৯৮০-র ৯ ধারায় সুব্রত বিশ্বাস ও সুমন মোল্যাকে ছয় মাস করে এবং সজিব ঘোষকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইউএনও জানান, এ চক্রের অন্য সদস্যদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

এ ছাড়া বগুড়ার সারিয়াকান্দি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে একজনকে সন্দেহভাজন মনে হলে চ্যালেঞ্জ করেন  সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল কাদির। পরে মাদরাসা শিক্ষক ফারুকের মোবাইল ফোনটি খুলে দেখা যায়, তাতে ফেসবুকের একটি গ্রুপের পেজে দিনে চলমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কপি রয়েছে। নির্দেশ পেলে পুলিশ ফারুককে গ্রেপ্তার করে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় অভিযুক্ত মাদরাসা শিক্ষককে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক সাজা না দিয়ে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল। আব্দুল কাদির বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তি সীমিত। কিন্তু এই অপরাধ গুরুতর। তার বড় সাজা দরকার। সংগত কারণেই পুলিশকে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দিয়েছি।’ 

এদিকে মানিকগঞ্জে ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় আটক কোচিং সেন্টারের দুই শিক্ষককে গতকাল তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আটককৃত শিক্ষকরা হলেন সিংগাইর উপজেলার ফ্রেস কোচিং সেন্টারের ইংরেজি শিক্ষক রুবেল হোসেন ও শরিফুল ইসলাম।

প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে সামাজিক আন্দোলনও। গতকাল রাজশাহীতে আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের মূলোৎপাটন দাবি করে। দাবি তোলা হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেরও।

আজ অনুষ্ঠেয় ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের প্রশ্নপত্র গতকাল থেকে বিক্রি চললেও শিক্ষার্থীদের বেশি আগ্রহ দেখা গেছে শনিবারের গণিত পরীক্ষার প্রশ্নের দিকে।

এদিকে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গত মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন বলে জানা গেছে। প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে জাতীয় সংসদে একাধিক সংসদ সদস্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন। এরপর মন্ত্রী রাজধানীর একটি বেসরকারি হোটেলে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানান বলে জানা যায়। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে গণভবনে ডেকে নিয়ে যান এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অনেক অবদান আছে বলে তাঁকে জানান। দু-একটি ঘটনায় সব অর্জন নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। পদত্যাগ না করে প্রশ্ন ফাঁসসহ সব ইস্যুতে শক্ত হাতে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে পরামর্শ দেন তিনি। এরপর শিক্ষামন্ত্রী মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর সব দপ্তরপ্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেন। এর পরও গতকাল সকালে ঠিকই ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নও পরীক্ষার আগে পাওয়া গেল।

ঢাকা, বগুড়া ও রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক এবং মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ প্রতিনিধির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।


মন্তব্য