kalerkantho


রেজিস্ট্রেশন বিভাগ এখন জনবান্ধব

রেজাউল করিম   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রেজিস্ট্রেশন বিভাগ এখন জনবান্ধব

আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত নিবন্ধন অধিদপ্তরের (রেজিস্ট্রেশন বিভাগ) চেহারা এখন পুরোই পাল্টে গেছে। দেশের নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার এই প্রতিষ্ঠানটিকে সম্প্রতি পরিদপ্তর থেকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। সব জেলা ও উপজেলায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মানসম্মত সেবা নিশ্চিতকরণে কর্মকর্তাদের দেশ-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মচারীদেরও দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের নানামুখী উদ্যোগের ফলে নিবন্ধন অধিদপ্তর এখন একটি সম্পূর্ণ জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাগরিক সুবিধা বাড়াতেই নিবন্ধন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার সব জেলা ও উপজেলায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিস ভবন নির্মাণ করছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৮টি জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ভবন এবং ২৩৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, ৩০৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে চারতলা ১৪টি জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ভবন এবং দুই ও তিনতলা ৯৮টি সাবরেজিস্ট্রি অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আর কোনো জেলা রেজিস্ট্রার ও সাবরেজিস্ট্রারকে ভাড়া বাসায় অফিস করতে হবে না। এ ছাড়া এই বিভাগকে আধুনিকায়নে নেওয়া হয়েছে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শেখ কাওসার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন বিভাগ। অ্যাডভোকেট আনিসুল হক মহোদয় আইনমন্ত্রী হওয়ার আগে এই বিভাগের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। এখন আমূল পরিবর্তন হয়েছে এই বিভাগের। পরিদপ্তর থেকে অধিদপ্তরে উন্নীত করেছেন। এ ছাড়া নাগরিকসেবা সহজ করার জন্য সব উদ্যোগ নিয়েছেন। এই বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। প্রতিটি জেলায় রেজিস্ট্রি ও সাবরেজিস্ট্রার ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এখন এই বিভাগকে ডিজিটাইজড করার জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন আইনমন্ত্রী। এ ছাড়া আরো নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এই বিভাগের জন্য।’

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শতাব্দীর প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন বিভাগে বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে বেশ উন্নয়ন করা হয়েছে। এর আগে এই বিভাগে কর্মরত প্রায় ১৫ হাজার নকলনবিশ নিয়মিত পারিশ্রমিক না পাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বালাম বই সরবরাহ না থাকায় কাজে স্থবিরতা ছিল। দুই বছরেরও বেশি সময় নকলনবিশদের পারিশ্রমিক বকেয়া থাকায় তাঁরা কলমবিরতি, মানববন্ধনসহ নানা ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করায় বালামে মূল দলিল নকলের কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারি প্রকাশনা ও মুদ্রণালয় থেকে নিয়মিত বালাম বই ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফরম সরবরাহ না থাকায় মানুষকে মূল দলিল ফেরত পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিষয়টি অবগত হওয়ার পর এ সমস্যা নিরসনে উদ্যোগী হন। তিনি দ্রততার সঙ্গে মানসম্পন্ন বালাম বই ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফরম সরকারি প্রকাশনা ও মুদ্রণালয়ের পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থায় ছাপানোর উদ্যোগ নেন। এরই মধ্যে মোট তিন দফায় ২০ কোটি টাকার দুই লাখ ৩৫ হাজার বালাম বই ও অন্যান্য ফরম ছাপিয়ে সারা দেশের জেলা ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন। একই সঙ্গে নকলনবিশদের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধের জন্য ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম দফায় ২৫ কোটি এবং দ্বিতীয় দফায় ৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ গ্রহণ করে তাঁদের বকেয়া পারিশ্রমিক বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। ফলে নকলনবিশরা তাঁদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। পর্যাপ্ত বালাম বই সরবরাহ থাকায় এবং বকেয়া বিল পেয়ে নকলনবিশদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে এবং কাজও গতি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের সব এলাকায় মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মূল দলিল ফেরত পাচ্ছে। একই সঙ্গে নকলনবিশদের পারিশ্রমিক প্রতি মাসে প্রদানের জন্য নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে জানান, রেজিস্ট্রেশন বিভাগ প্রতিবছর প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পেছনে বছরে ব্যয় হয় মাত্র ২০০ কোটি টাকা। পরিদপ্তর থাকা অবস্থায় ক্ষুদ্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের সঠিক তদারকি করার সুযোগ ছিল না। এ জন্য কর্মকর্তাদের মাঝেও এক ধরনের হতাশা ছিল। অধিদপ্তরে উন্নীত করার পর সেই হতাশা নিরসন হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নিবন্ধন পরিদপ্তর ভারত উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হলেও বাংলাদেশে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিশেষ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে নিবন্ধন পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্যোগের ফলে ২০১৬ সালে সব জেলা রেজিস্ট্রার ও সাবরেজিস্ট্রারকে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পর্যায়ক্রমে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং এর মাধ্যমে এই বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের দ্বার উন্মোচিত হয়। তাঁদের এখন বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ (বিপিএটিসি) দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুণগত মানসম্পন্ন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দুটি দল ইংল্যান্ডে উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছে। সূত্রে জানা গেছে, নিবন্ধন অধিদপ্তরের জন্য দেশের প্রতিটি বিভাগে বিভাগীয় নিবন্ধন কর্মকর্তার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। নতুন সৃষ্ট ৪৯১টি পদের মধ্যে প্রতিটি বিভাগীয় কার্যালয়ে একজন করে বিভাগীয় নিবন্ধন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন এবং সেসব কার্যালয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল নিয়োগ করা হবে। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে নিবন্ধন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত হবে।

রেজিস্ট্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতি রোধে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইনের সংস্কার ও বিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। ভূমির মালিকদের মূল দলিল ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম দ্রুত করার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বালাম বই সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। নকলনবিশদের পারিশ্রমিক ১৬ টাকা থেকে ২৪ টাকায় বৃদ্ধি এবং নকলনবিশদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন মন্ত্রণালয়। জনগণকে দ্রুত সেবা প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি রেজিস্ট্রেশন অফিসে সাবরেজিস্ট্রার নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের জেলা রেজিস্ট্রার ও সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় ও রেকর্ড রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন নিশ্চিত করা হয়েছে।


মন্তব্য