kalerkantho


আ. লীগে আতিকের ‘বাধা’ ছানু বিএনপির ছক হযরতকে ঘিরে

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগে আতিকের ‘বাধা’ ছানু বিএনপির ছক হযরতকে ঘিরে

নির্বাচনের বছরে শেরপুরে রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। সাংগঠনিকভাবে শেরপুর-১ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থান বেশ শক্ত। ১৯৯৬ সাল থেকেই এ আসনটি ক্ষমতাসীন দলটির দখলে আছে।

এ আসন থেকে পর পর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিউর রহমান আতিক। সংসদে সরকারি দলের হুইপ আতিক আগামী নির্বাচনেও মনোনয়নপ্রত্যাশী। কিন্তু তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানোয়ার হোসেন ছানু। দলের আরো কয়েকজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও আলোচনা কেন্দ্রীভূত এ দুজনকে ঘিরেই।

অন্যদিকে জোটের রাজনীতির স্বার্থে বিগত চারটি জাতীয় নির্বাচনে শেরপুর-১ আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। যে কারণে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ না পেয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে একধরনের হতাশা নেমে আসে। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিএনপির নেতারা। তাঁদের আশা, এবার দলটির প্রার্থীকেই এ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলীকে নিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।

নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজাটের শরিক হলেও জাতীয় পার্টি এখন সংসদে বিরোধী দল। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াছ উদ্দিন ও জেলা জাসদ সভাপতি মনিরুল ইসলাম দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

জামায়াত রাজনৈতিকভাবে মাঠে না থাকলেও ফাঁসি কার্যকর হওয়া কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইমাম ওয়াফি প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছেন।

আওয়ামী লীগ : একবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুবাদে এলাকার উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতিউর রহমান আতিকের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হবেন।

তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে রাগ-ক্ষোভ, বিভিন্ন কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর আতিকবিরোধী একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ওই বলয়ের নেতাকর্মীরা ‘আতিক ছাড়া নৌকা’র দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের আশীর্বাদ নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের প্রত্যাশায় মাঠে সক্রিয় রয়েছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ছানোয়ার হোসেন ছানু। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন জেলা পরিষদ চেয়ারমান হুমায়ুন কবীর রুমান ও জেলা যুবলীগ সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিব। তাঁরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ছানুকে জেলা আওয়ামী লীগের আগামী দিনের কাণ্ডারি এবং সংসদ সদস্য প্রার্থী বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, ভোট প্রার্থনা করছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বাস-কোচ মালিক সমিতির সভাপতি হওয়ায় শ্রমিক ও মালিক সংগঠনে ছানুর রয়েছে আলাদা প্রভাব। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আতিক এমপির দিন শেষ হয়ে গেছে। তাঁকে এখন আর মানুষ চায় না। তিনি নিজেকে দুখিনী মায়ের সন্তান বলে বক্তব্য দিলেও এখন মানুষ তাঁর বাড়ি-গাড়ি, সহয়-সম্পত্তির সব খবর জানে। এলাকার মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, তাই আমি দলীয় মনোনয়নের জন্য মাঠে নেমেছি।’

এ ব্যাপারে হুইপ আতিউর রহমান আতিক বলেন, ‘আগামী নির্বাচনেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে এবং দলীয় মনোনয়নে বিজয় নিশান আমার হাতেই উড়বে বলে বিশ্বাস ও ভরসা রাখি। দলের ভেতরকার কিছু লোক যাঁরা আমার বিরোধিতা করছেন, একসময় তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পারবেন বলে আমি মনে করি। যাঁরা আমার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাঁদের আমিই জনপ্রতিনিধি করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘শেরপুরের সকল মানুষ জানে আমি যোগ্যতা ও সততার সাথে কাজ করছি। যাঁরা আমার সমালোচনা করেন তাঁরা আমার জনপ্রিয়তাকে ভয় পান।’

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফাতেমাতুজ্জোহরা শ্যামলী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুন্নাহার কামাল ও সাবেক গভর্নর মরহুম আনিসুর রহমানের ভাতিজা জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলৗ মাহবুবুল আলম মঞ্জু, প্রজন্ম-৭১ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ফামা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমান আজিজ।

ফাতেমাতুজ্জোহরা শ্যামলী বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিচ্ছেন। আমাকে মহিলা এমপি করে সম্মানিত করেছেন। আমি এবার সরাসরি নির্বাচন করতে চাই।’

জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুন্নাহার কামাল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। নারী উন্নয়ন, নেতৃত্ব গঠন ও নারীর কর্মসংস্থানে আমি দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমি এলাকার নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে আরো কাজ করতে চাই। তাই আমি শেরপুর-১ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।’

জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মুক্তিযুদ্ধকালীন স্কোয়াড্রন লিডার মাহবুবুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইব। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, মনোনয়ন পেলে আশা করি নির্বাচনেও বিজয়ী হতে পারব।’

প্রজন্ম-৭১ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, ‘মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ। দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমাদের আন্দোলনের কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত হয়েছে। শেরপুরের কুখ্যাত রাজাকার কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়েছে। যে কারণে পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে নির্বাচনে অংশ নিতে চাই।’

এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চন্দন কুমার পাল, সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নিজামউদ্দিন আহম্মদের ছেলে পৌরসভার মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আনোয়ারুল হাসান উৎপল মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বিএনপি : স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে শেরপুর সদর আসন থেকে খন্দকার আব্দুল হামিদ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে নজরুল ইসলাম বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তাঁরা দুজনই প্রয়াত। এরপর জোটগতভাবে নির্বাচনের কারণে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা কামারুজ্জামানকে আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। কিন্তু পর পর চারবার জোটগতভাবে এবং একবার দলীয়ভাবে নির্বাচন করেও কামারুজ্জামান জয়ের মুখ দেখেননি।

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এ আসনে বিএনপির প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের দাবি জোরালো হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারাও সেই দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করেছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলীকে নিয়ে মাঠে কাজ করছে দলীয় নেতাকর্মীরা। প্রচার ও গণসংযোগে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।

আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের মাঠে বিজয়ী হতে চায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। শেরপুর সদরে স্থানীয় সরকারের দুটি উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের জয় তাঁদের আরো আশাবাদী করে তুলেছে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলী বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শেরপুরে বিএনপি এখন অনেক শক্তিশালী। ২১ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানের শীষে ভোট দিতে পারেনি। এবার তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দল সুসংগঠিত। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত। যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, তাহলে আমরাই জয়ী হব।’

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন তৌহিদুর রহমান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম।

জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য : শেরপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াস উদ্দিনকে এ আসনে দলীয় প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

ইলিয়াছ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মহাজোটের কাছে এ আসনটি জোরদারভাবেই চাইব। শেরপুরের চরাঞ্চল জাতীয় পার্টি তথা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘাঁটি। এ আসনে তিনবার জাতীয় পার্টির এমপি হয়েছে। আমরা গত দুবার মহাজোটের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু মহাজোটের শরিক হিসেবে আমাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কষ্টের কথা এরশাদ সাহেব জানেন, তাই তিনি বলেছেন, এবার মহাজোট হলে শেরপুর থেকে জাতীয় পার্টিই মনোনয়ন পাবে। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

শেরপুর জেলা জাসদের (ইনু) সভাপতি সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘আমি দশম সংসদ নির্বাচন করেছি দলীয় প্রতীকে। এবার ১৪ দলের শরিক হিসেবে আমি মনোনয়ন চাইব। সে লক্ষ্যে মাঠে কাজ করে যাচ্ছি।’

এ আসনে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের চতুর্থ ছেলে হাসান ইমাম ওয়াফি প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছেন বলে জানা গেছে। ২০ দলীয় জোট থেকে তিনি মনোনয়ন পেলে জোটের পক্ষে জেতা সহজ হবে বলে জামায়াত সমর্থকরা মনে করেন।

হাসান ইমাম ওয়াফি বলেন, ‘২০ দলীয় জোটের অনেক নেতাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাঁরা বলছেন, মাঠ ছাড়া যাবে না। কিভাবে নির্বাচন হবে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে আমরা নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।’



মন্তব্য