kalerkantho


আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি, বিএনপিতে ৩

আজিজুর রহমান চৌধুরী, জামালপুর   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি, বিএনপিতে ৩

জামালপুর-৫ (সদর) আসনটি স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ভোটের পরিসংখ্যানও সেটাকে সমর্থন করে। স্বৈরশাসক এরশাদের সময় একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী এবং ১৯৯১ সালে বিএনপি প্রার্থী নির্বাচিত হন। বাকি সব সংসদে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল।

একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি মাঠে তৎপর হয়ে উঠেছে। জাতীয় পার্টির উপস্থিতিও রয়েছে।

মাঠপর্যায় ঘুরে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অন্তত ১১ জন নেতা মনোনয়ন চান বলে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে আলোচনায় আছেন বিএনপির তিনজন। জাতীয় পার্টির একজন নির্বাচন করার লক্ষ্যে মাঠে কাজ করছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করেছিল। তবে দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকায় নেতাকর্মীরা বলছে, আসনটি পুনরুদ্ধার করতে হলে দলীয় কোন্দল নিরসন করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আসনটি রাখার ব্যাপারে প্রত্যয়ী। সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকলেও মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর দলের প্রার্থীর পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে বলে মনে করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ : সাবেক ভূমিমন্ত্রী প্রবীণ রাজনীতিবিদ রেজাউল করিম হীরা বর্তমানে জামালপুর-৫ আসনে সংসদ সদস্য। জাতীয় সংসদের ১৪২ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটি থেকে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি সম্ভাব্য প্রার্থী। অন্যদিকে দলের আরো ১০ নেতা মনোনয়ন চান বলে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ, দলের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির সদস্য ও জামালপুর জেলা কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোজাফফর হোসেন, জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম রেজনু, সদর উপজেলা শাখার সভাপতি ডা. আব্দুল মান্নান, জেলা শাখার সহসভাপতি এইচ আর জাহিদ আনোয়ার, একই শাখার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহম্মেদ চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মারুফা আক্তার পপি, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিজন কুমার চন্দ ও জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আ ব ম জাফর ইকবাল জাফু।

মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা দাবি করছেন, রেজাউল করিম হীরা বিগত ১৯ বছরে আশানুরূপ উন্নয়ন ঘটাতে পারেননি। সম্প্রতি এলাকার উন্নয়নে অনেকটাই অমনোযোগী হয়ে পড়েছেন তিনি। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীরা নতুন কাউকে প্রত্যাশা করছে।

ইঞ্জিনিয়ার মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘প্রায় দুই যুগ ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছি। বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে এই আসনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে থেকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত রেখেছি। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েছি। আগামীতে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে এ প্রত্যাশায় নিরলসভাবে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

রেজাউল করিম রেজনু বলেন, তিনি এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এ ছাড়া জামালপুর জেলা শহরসহ তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মীর আপদে-বিপদে সহযোগিতা করে আসছেন। তিনি বিগত দিনে তিনবার দলের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হলেও আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী।

ডা. আব্দুল মান্নান বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনুরোধে তিনি নিজেই এ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চান। সে লক্ষ্যে আগাম নির্বাচনী প্রচারে নেমে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন এবং দলকে সুসংগঠিত করছেন।

এইচ আর জাহিদ আনোয়ার বলেন, ‘বিগত জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে জয়লাভ করতে পারিনি। তবে ওই নির্বাচনে জামালপুর পৌরসভাসহ জামালপুর সদর উপজেলার সর্বত্রই আমার জনপ্রিয়তা অধিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সর্বোপরি আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আমি নৌকার মনোনয়ন পাব বলে শতভাগ আশাবাদী।’

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী বলেন, জামালপুর-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আগাম নির্বাচনী গণসংযোগে এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কল্যাণে দানের হাত প্রসারিত রেখেছেন এবং নিজ এলাকার সমাজসেবায় অবদান রাখতে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে এলাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন শিশুপার্ক নির্মাণ করেছেন। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে তাঁর ভোটব্যাংক রয়েছে বলে তিনি জানান। ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী বলেন, নৌকার মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘বিগত দিনে আমি এ আসন থেকে চারবার নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চেয়েছি। আসন্ন নির্বাচনেও আমি দলীয় মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী আমি।’

রেজাউল করিম হীরা বলেন, তিনি এলাকায় বহু স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে এলাকার বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে চাকরি দিয়েছেন। জামালপুর মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা, ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণ ও জেলা শহরের যানজট রোধে দুটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং জেলা শহরে একটি দৃষ্টিনন্দন কালচারাল ভিলেজ ও দুটি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ ছাড়া জামালপুর সদর আসনে বহু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। জামালপুর সদর উপজেলাবাসী তাঁকে আবারও প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায় বলে তিনি দাবি করেন।

বিএনপি : এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তিনজন। তাঁরা হলেন দলের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য সাবেক স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী সিরাজুল হক।

তাঁদের মধ্যে ওয়ারেছ আলী মামুন দীর্ঘদিন ধরে জেলা বিএনপির সব কার্যক্রম বলতে গেলে এককভাবেই পরিচালনা করে আসছেন। তিনি বিগত দিনে দুইবার জামালপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। ভূমিকা রেখেছেন পৌরসভার সার্বিক উন্নয়নে। ওয়ারেছ আলী মামুন সদর উপজেলায় মানুষের নানা সমস্যায় পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি নির্বাচনী এলাকায় দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে নিলুফার চৌধুরী মনি ঢাকায় অবস্থান করলেও দলের কেন্দ্রীয় কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। তিনি মাঝেমধ্যে এলাকায় এসে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগ করে নির্বাচন করার আগ্রহের কথা জানাচ্ছেন।

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘আমি বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্দেশে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়মিত দলের সাংগঠনিক কাজ করছি এবং মাঝেমধ্যে এলাকায় গিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ করেছি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি ৯৯ ভাগ আশাবাদী।’

সিরাজুল হকও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। তিনিও ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী মনোনীত হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে জামালপুর জেলা বিএনপির সব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করছি। জামালপুর পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের সর্বস্তরেই বিএনপিকে সুসংগঠিত রাখতে রাত-দিন নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছি। এ ছাড়া আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় সুনিশ্চিত করতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছি। আমি শতভাগ বিশ্বাস করি, আসন্ন নির্বাচনে আমি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাব।’

জাতীয় পার্টি : এ আসনে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী দলটির জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকির হোসেন খান। জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য এ প্রার্থী আগাম নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হলেও দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন।

জাকির হোসেন খান দাবি করেন, উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি জামালপুর সদরে। সদর উপজেলার রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং অনেক স্থানে ব্রিজ-কালভার্ট না থাকায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকেও। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, এর অবসান চায়। শান্তির জন্য পরিবর্তন, পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পার্টি—এ লক্ষ্যেই আমি এ আসনে কাজ করে যাচ্ছি।’

 



মন্তব্য