kalerkantho


নতুন আইজিপির সামনে ৮ চ্যালেঞ্জ

সরোয়ার আলম   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন আইজিপির সামনে ৮ চ্যালেঞ্জ

ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী

দায়িত্ব নিলেন বাংলাদেশ পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। গতকাল বুধবার দুপুরে বিদায়ী আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। জাবেদ পাটোয়ারী ৪০তম আইজিপি।

দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রেওয়াজ অনুযায়ী গতকাল বিকেলে বিদায়ী আইজিপিকে বহনকারী গাড়িটি কর্মকর্তারা রশি দিয়ে টেনে পুলিশ সদর দপ্তরের বাইরে নিয়ে যান। এভাবেই বিদায় জানানো হয় বিদায়ী পুলিশপ্রধানকে।

এদিকে দায়িত্ব নেওয়া নতুন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে আটটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়কে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো বা ঘটে গেলে তা কঠোর হস্তে দমন করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া পুলিশ সংস্কার আইন বাস্তবায়ন করাও জাবেদ পাটোয়ারীর জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন আইজিপি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ লোক। যেকোনো চ্যালেঞ্জই তিনি মোকাবেলা করতে পারবেন।  

এ প্রসঙ্গে নতুন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশে যোগদানের দিন থেকেই পুলিশের চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হতে হয়। পুলিশের জীবনে প্রতিদিন ইউনিক। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা ঘটে। পুলিশ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শত্রুদের সঙ্গে লড়েছে, কিন্তু পিছপা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নে লালিত পুলিশ সব সময় জয়ী হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকবে। সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, নতুন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হবে। বিদায়ী আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক যেভাবে কাজ করেছেন তাঁর চেয়ে বেশি উদ্যমে তাঁর কাজ করতেই হবে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাঠপর্যায়ে কাজ না করায় তাঁর জন্য আরো বেশি চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব কমিয়ে আনাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তারা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, চলতি বছরের শেষের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। গত সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনটি সরকারের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জের। এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পাশাপাশি তা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে নতুন আইজিপিকে।

তা ছাড়া আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। ওই মামলায় প্রধান আসামি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুই দিন আগে ঢাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে তিন নেতাকর্মীকে ছিনিয়ে নিয়েছে।

তা ছাড়া বিএনপি মাঠে নামার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে। রায়ের দিন, তার আগে ও পরে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জাবেদ পাটোয়ারীর। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরকে মোকাবেলা করতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

ওই কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, বিদায়ী আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার সময় সারা দেশে আগুন ও পেট্রল দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলে আসছিল। ওই সময় শহীদুল হক শক্তভাবে তাদের মোকাবেলা করেছিলেন। এবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এসব ঘটনা যাতে না ঘটে বা ঘটলে তাত্ক্ষণিক প্রতিরোধ করতে হবে নতুন আইজিপিকে। তা ছাড়া নাশকতা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভিযোগ আছে থানাগুলোতে গিয়ে লোকজন নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিদায়ী আইজিপিও গতকাল স্বীকার করেছেন, থানাগুলোয় সেবার মান বাড়াতে পারেনি। নতুন আইজিপিকে এই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। থানায় সেবার মান বাড়াতে হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন আইজিপিকে পুলিশ আইন সংস্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের তৈরি করা ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে।

নতুন আইজিপির আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো পুলিশকে একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল বাহিনীতে রূপান্তরিত করা। পুলিশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সূক্ষ্মভাবে দমন করতে হবে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে সবাইকে এক চোখে দেখতে হবে।

পুলিশের নিয়োগ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ আছে দীর্ঘদিন ধরেই। এই অনিয়ম বন্ধ করতে নতুন করে উদ্যোগ নিতে হবে জাবেদ পাটোয়ারীকে। জঙ্গিদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বিশেষ করে নব্য জেএমবি এখনো ওত পেতে আছে। তারা যেকোনো সময় হামলা করতে পারে বলে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে। এ কারণে জঙ্গি নিধনে আরো জোরালো অভিযান চালাতে হবে নতুন আইজিপিকে। জঙ্গিদের পাশাপাশি বাংলাদেশে বড় সমস্যা মাদক। বিদায়ী আইজিপি মাদক নির্মূল করার উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেননি। নতুন আইজিপিকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে বলেছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব চ্যালেঞ্জ নতুন আইজিপির জন্য কঠিন। তবে তাঁর পেশাদারির কারণে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারবেন।     

এ কে এম শহীদুল হকের বিদায় : জানা যায়, গতকাল সকাল থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা বিদায়ী আইজিপি শহীদুল হককে বিদায় জানান। এই সময় শহীদুল হক অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সবার কাছে দোয়া চান। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শহীদুল হক আইজিপির দায়িত্ব নেন। বিদায়ের বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। নবনিযুক্ত আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে বরণ করতে ব্যস্ত ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ৪০তম হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। দীর্ঘ তিন বছর এক মাস শহীদুল হক দায়িত্ব পালন করেন। শহীদুল হকের বিদায় উপলক্ষে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রথমবারের মতো এক বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নবনিযুক্ত আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। পুলিশের সব রেঞ্জের ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনারসহ বিভিন্ন সেক্টরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় কনস্টেবল, এসআই, সহকারী পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের কর্মকর্তারা গত তিন বছর এক মাস দায়িত্ব পালনকালে এ কে এম শহীদুল হকের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, স্মৃতিচারণা ও তাঁর সাফল্য তুলে ধরেন।

বিদায় সংবর্ধনা উপলক্ষে গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রবেশ করেন সদ্য বিদায়ী আইজিপি শহীদুল হক, নবনিযুক্ত আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান। নবনিযুক্ত আইজিপি ও বিদায়ী আইজিপিকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। 

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সদ্য বিদায়ী আইজিপি শহীদুল হক বলেন, ‘দায়িত্বকালে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল পুলিশ সদস্যদের স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করে তা মোকাবেলা করেছি। দেশে অসাংবিধানিক সরকার যাতে না আসতে পারে সেই দিক লক্ষ রেখে কাজ করেছি। ৩২ বছর পুলিশ বিভাগে চাকরি জীবনে দেশের বিভিন্ন জেলায়, পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের ভালোবাসি পেয়েছি। তাই চাকরি শেষে আমি পূর্ণ সন্তুষ্টি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। আমি হতাশ নই, কোনো ক্ষোভও নেই।’ নবনিযুক্ত আইজিপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পুলিশকে যে উচ্চমাত্রায় নিয়েছি, আশা করছি নতুন আইজিপি সেই ধারা অব্যাহত রাখবেন। ২০১৩ সালে বোমা হামলা ও অগ্নিসন্ত্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করেছি।

পরে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিদায় নেন শহীদুল হক। এ সময় এক প্রশ্নে তিনি বলেন, মানুষের অনেক স্বপ্ন থাকে, সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। তবে আইজিপি হওয়ার আগে তাঁর যেসব স্বপ্ন ছিল তার বেশির ভাগই পূরণ হয়েছে। ২০টি নির্দেশনা দিয়েছি। তিনটি কোড দিয়ে বিদেশের মতো পুলিশি সেবা চালু করার ইচ্ছা তাঁর আইজিপি হওয়ার আগে ছিল। আইজিপি হওয়ার পর সেই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চালু করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে মানুষ বিপদে পড়ে সেবা পেতে প্রথমে থানায় ছুটে যায়। তাই সাহায্য প্রার্থীরা থানায় গিয়ে যাতে সেবা পায় সেই লক্ষ্যে থানা পর্যায়ে সেবার মান উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু থানা পর্যায়ে সেই পরিবর্তন আনতে পারেননি। এখন অনেক সুশিক্ষিত যুবকরা পুলিশে আসছেন। তাঁর বিশ্বাস তাঁরা পুলিশে ভালো করবেন। নতুন আইজিপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে? এমন প্রশ্নে শহীদুল হক বলেন, এটি নির্বাচনী বছর। নির্বাচনকে ঘিরে অনেক ষড়যন্ত্র হবে, নাটক হবে। এগুলো মোকাবেলা করে নির্বাচন কমিশনের অধীনে থেকে নাগরিকের ভোটাধিকার প্রদান করা ও নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটা কঠিন হবে। তবে পুলিশপ্রধান ও পুলিশের সদস্যরা তা পারবেন বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।

 

 



মন্তব্য