kalerkantho


পরীক্ষা ছাড়া চালান ছাড় নয়

আমদানির গুঁড়া দুধে ভয়ংকর মাত্রার সিসা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম   

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমদানির গুঁড়া দুধে ভয়ংকর মাত্রার সিসা

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত সীমা অনুযায়ী গুঁড়া দুধে সিসার সহনীয় মাত্রা কেজিতে দশমিক ০২ মিলিগ্রাম। অথচ আমদানি করা গুঁড়া দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এই পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে স্বাভাবিক বা সহনশীল মাত্রার চেয়ে ৫০ থেকে ২০০ গুণ বেশি।

এই অবস্থায় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সব ধরনের গুঁড়া দুধ আমদানিতে শতভাগ চালানে সিসা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এর ফলে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি সব স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে আমদানি করা গুঁড়া দুধ এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ছাড় পাবে।

খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমদানি পর্যায়ে ও গুদামে থাকা পণ্যগুলো পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত বাজারজাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত বাজারজাত করতে পারবে না এমন শর্তে আমদানিকারক বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে গুদামজাত করতে পারবে।

তা ছাড়া দেশের দুধ উৎপাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করতে আগামী সপ্তাহে বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের মতামত শোনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।

গুঁড়া দুধ আমদানিতে চালানের শতভাগ পরীক্ষা অর্থাৎ প্রতিটি চালানের ল্যাব পরীক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব ড. মোহাম্মদ খালেদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠি গতকাল বৃহস্পতিবার সব কাস্টম হাউস কমিশনার বরাবর পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুঁড়া দুধের মধ্যে যে হেভি মেটাল (সিসা) পাওয়া গেছে, তা মানবদেহ, বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাবিধানের জন্য আমদানি পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এ চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।’ তবে বাজারে থাকা এসব দুধের বিষয়ে কী হবে—এ প্রশ্নে মাহফুজুল হক বলেন, ‘আপাতত বাজারে থাকা গুঁড়া দুধের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

এত দিন গুঁড়া দুধ আমদানিতে কেবল বাছাই করা চালানের রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা করা হতো। কিন্তু মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সিসা কিংবা বিভিন্ন ধরনের হেভি মেটাল পরীক্ষা করা হয়নি কখনোই। ফলে বছরের পর বছর এ ধরনের ক্ষতিকর পদার্থযুক্ত গুঁড়া দুধ আমদানি হতো দেশে। কোনো কোনো গুঁড়া দুধ বিদেশ থেকে সরাসরি প্যাকেটজাত হয়ে আসে; কোনোটি দেশের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে প্যাকেট বা টিনজাত করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে বাজারে ছাড়া হয়।

নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ও সরকারের যুগ্ম সচিব মাহবুব কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একের পর এক অভিযোগ আসার পর ঢাকার বাজারে থাকা বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ সংগ্রহ করে ঢাকার একাধিক ল্যাবে পরীক্ষা করি। সেখানে ভয়াবহ মাত্রা অর্থাৎ ৫০ থেকে ২০০ গুণ বেশি সিসার উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। অথচ সহনীয় মাত্রা হচ্ছে প্রতি কেজিতে মাত্র দশমিক ০২ মিলিগ্রাম।’

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওই সদস্য জানান, বেশ কটি ব্র্যান্ডের দুধে এই প্রমাণ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সব ধরনের গুঁড়া দুধ আমদানিতে শতভাগ চালান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা দিয়েছে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অন্য হেভি মেটালের উপস্থিতি ক্ষতিকর মাত্রায় পাওয়া না যাওয়ায় সেগুলোর পরীক্ষা আপাতত করা হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমদানিকৃত গুঁড়া দুধের সব চালানের নমুনা যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সিলগালা করে ঢাকা অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টার, শাহবাগ; বিসিএসআইআর (সায়েন্স) ল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড; ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ মহাখালী, ঢাকা—এই তিনটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠিয়ে পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘পরীক্ষার রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত আমদানিকৃত চালান সমুদ্র, বিমান ও স্থলবন্দর থেকে ছাড় করে আমদানিকারক নিজেদের জিম্মায় গুদামে নিতে পারবেন। তবে পরীক্ষার রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত বাজারজাত করা হবে না মর্মে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে আমদানিকারককে। রিপোর্ট আসার পর ফলাফলের কপি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে পাঠাতে হবে। এরপর কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট হাতে নিয়ে বিষয়টি গুদামে গিয়ে যাচাই করে নিশ্চিত হয়েই গুঁড়া দুধ চালান ছাড় করবেন এরপর বাজারজাত করবেন। রিপোর্ট নেতিবাচক এলে সেই পণ্য ধ্বংস বা রপ্তানিকারক দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’

তবে শর্তসাপেক্ষে এসব গুঁড়া দুধ আমদানিকারকের গুদামে নেওয়ার নিয়ম করার বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব কবীর বলেছেন, ল্যাব থেকে নমুনা পরীক্ষার একটি প্রতিবেদন আসতে ২০ দিনের মতো সময় লাগবে। এত দিন এসব পণ্য বন্দরে আটকে থাকলে আমদানিকারকের ভাড়া বাবদ প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হবে, আবার বন্দরে জট লেগে যাবে। সেই দিক বিবেচনায় সাময়িক সময়ের জন্য সেগুলো ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়লে এই পদ্ধতির পরিবর্তন করা হবে বলে তিনি জানান।

কিন্তু এই পদ্ধতিতে ঝামেলার শঙ্কা করছে চট্টগ্রাম কাস্টম। চট্টগ্রাম কাস্টমের গুঁড়া দুধ আমদানি গ্রুপের সহকারী কমিশনার বায়েজিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘আমদানি নীতি অনুযায়ী এখন আমরা বিভিন্ন ল্যাব রিপোর্ট আসার পরই পণ্য চালান ছাড় করি। কিন্তু নমুনা পরীক্ষার আগে বন্দর থেকে ছাড় করে আমদানিকারকের জিম্মায় গুদামে রাখতে বলা হচ্ছে। আমদানিকারক ল্যাব রিপোর্ট আসার আগে বাজারে বিক্রি করে দিবে না তার গ্যারান্টি কে দিবে বা তদারকিই কে করবে? ল্যাব রিপোর্ট যদি নেগেটিভ আসে তাহলে এই চালান কী হবে। এসব বিষয় ঝামেলাপূর্ণ। এর পরও আমরা কমিশনার মহোদয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিব।’

কমিশনার বায়েজিদ হোসেন জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যেসব গুঁড়া দুধ আমদানি হয় সেগুলো কেবল রেডিয়েশন পরীক্ষা নিশ্চিত হয়েই বন্দর থেকে ছাড় করা হয়। আমদানি নীতিতে না থাকায় সিসা বা হেভি মেটাল পরীক্ষা করা হয় না।

এসব হেভি মেটাল বা ভারী ধাতু উচ্চমাত্রায় শরীরে গেলে কী কী স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব পদার্থ শরীরে প্রবেশের পর নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে। তাৎক্ষণিক এগুলোর ক্ষতি আঁচ করা যাবে না। শরীরের লিভার ও কিডনির কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হবে। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি।’

সম্প্রতি ‘সালমোনেলা’ নামের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দূষণের কারণে ফরাসি শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ল্যাকটালিস ৮৩টি দেশ থেকে তাদের গুঁড়া দুধ তুলে নিচ্ছে। বাংলাদেশেও ‘ল্যাকটালিসের’ তৈরি দূষিত এই দুধ আমদানি হয়েছিল। একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ২০ হাজার ৩৩৫ কার্টন দুধ আমদানি করেছিল, যা ‘বেবিকেয়ার ১’ এবং ‘বেবিকেয়ার ২’ নামে বাজারে বিক্রি হয়। ফরাসি ওই কম্পানি নিজে ঘোষণা দেওয়ার পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ল্যাকটালিসের এই দুই ব্যাচের দুধ বাজেয়াপ্ত করেছে। তারা আমদানি প্রতিষ্ঠানের গুদামে গিয়ে ১১ হাজার ৬১৬ কার্টন দুধ সিলগালা করে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, বছরে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি হয় দেশে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে ৮৫ শতাংশ দুধ আমদানি হয়। তবে ইদানীং ভারত থেকেও আমদানি বাড়ছে।


মন্তব্য