kalerkantho


মাগুরা সদর

পুলিশের আক্ষেপ, ধরলেই বলে নেতার সঙ্গে কথা বলেন

শামীম খান, মাগুরা   

২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুলিশের আক্ষেপ, ধরলেই বলে নেতার সঙ্গে কথা বলেন

“ছেলেপেলে যেসব মোটরসাইকেল ব্যবহার করে তার বেশির ভাগই অবৈধ। কাগজপত্র নেই। অনেকে আবার ভারত থেকে চোরাইপথে আনা টানা গাড়ি কিনেছে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। রাস্তায় গাড়ি ধরলেই মোবাইল ফোনে কাউকে না কাউকে কল দিয়ে বলে, ‘নেন নেতার সাথে কথা বলেন।’ সেদিন তিনজন এক মোটরসাইকেলে চড়েছে বলে ধরলাম, একই ঘটনা।” এই মন্তব্য মাগুরা সদর থানার এক এসআইয়ের (উপপরিদর্শক)।

গত সোমবার সন্ধ্যয় মাগুরা সদর থানা চত্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন চার এসআই। একজনের কথা শেষ হতেই আরেকজন বলেন, ‘নাটোরে এ রকম একটি ঘটনায় আমি এক নেতাকে আমার মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলেছিলাম—নেন, আমার নেতার সাথে কথা বলেন।’ এভাবে কিছুক্ষণ নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে হাসতে হাসতে স্থান ত্যাগ করেন তাঁরা। তাঁদের আলোচনায় জানা গেল, জেলা শহরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অবৈধ মোটরসাইকেল আছে; কিন্তু রাজনৈতিকসহ নানা চাপে ব্যবস্থা নিতে পারে না পুলিশ।

সন্ধ্যা ৭টায় থানায় উপপরিদর্শক ইমরুলের কাছে একটি অভিযোগ নিয়ে আসেন সদর উপজেলার সাচানী গ্রামের যুবক রফিকুল ইসলাম। একই গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ, মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছেন জাহাঙ্গীর। এক বছর আগে মালয়েশিয়ার ভিসার জন্য জাহাঙ্গীরকে দেড় লাখ টাকা দেন রফিকুল। কিন্তু এখনো জাহাঙ্গীর ভিসা দেননি। একই গ্রামের আবু তালেব ও লিটন মিয়াও মালয়েশিয়ার ভিসার জন্য জাহাঙ্গীরকে সাড়ে চার লাখ টাকা করে দিয়েছেন; কিন্তু এখনো ভিসা পাননি। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার আশ্ব্বাস দিলেন এসআই।

সাড়ে ৭টার দিকে থানার ওসি ইলিয়াস হোসেনের কক্ষে ঢোকেন সদর উপজেলার নরসিংহাটির ব্যবসায়ী তারিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকায় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়ের জন্য তিনি শহরের ভায়না মোড়ের একটি এজেন্সি থেকে ২৩ হাজার টাকা পাঠান। কিছুক্ষণ পরই নিজেকে সজল নামে পরিচয় দিয়ে এক যুবক চারটি ফোন নম্বর থেকে তারিকুলের মেয়ের মোবাইল ফোন নম্বরে ফোন দেন। ওই যুবক জানান, মূল টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু টাকা ভুলক্রমে চলে গেছে। এরপর তিনি কয়েকটি ডিজিট চাপতে বলেন। আর ওই সব ডিজিটে চাপ দেওয়ার পরপরই তারিকুলের মেয়ের মোবাইল ফোনে যাওয়া টাকা উধাও। মেয়ে ওই ঘটনা তারিকুলকে জানালে তিনি কথিত সজলের মোবাইল ফোন নম্বরসহ থানায় অভিযোগ দিতে আসেন। ওসি ইলিয়াস হোসেন তাঁকে সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দেন।

থানার মূল গেটের পূর্ব দিকে টাইলস মোড়ানো গোলঘরে বসে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে বাদী ও বিবাদী পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের কর্মকর্তারা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার একটু পর জমিসংক্রান্ত একটি বিরোধের ঘটনায় এক পক্ষের সঙ্গে কথা বলছিলেন এসআই রাকিব উদ্দিন। বিবাদী পক্ষ ফারুক হোসেনের বক্তব্য, সদরের দোড়া মতনা গ্রামে ১৯৭২ সালে তাঁর বাবা চেনের উদ্দিন একটি জমি কিনেছিলেন, যেখানে তিনি এবার ধান লাগিয়েছেন। কিন্তু এত দিন পর জমি বিক্রেতা ইমান উদ্দিনের ছেলে জুমারত ওই জমি নিজেদের বলে দাবি করে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। এর তদন্তভার এসআই রাকিবের ওপর। ফারুক তাঁর কাছে দাবি করেন, ৪৬ বছর ধরে জমিটি তাঁদের দখলে আছে। রাকিব জানান, দুই পক্ষের কাগজপত্র দেখেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাত ৮টায় থানার সবচেয়ে বড় কক্ষটিতে বসে কাজ করছিলেন চারজন উপপরিদর্শক। থানার মূল ভবনে ঢুকতেই পরিদর্শক (তদন্ত) হোসেন আল মাহবুবের কক্ষ। একেবারে পশ্চিমে ওসির এবং তাঁর আগের কক্ষটি পরিদর্শক (অপারেশন) সাইদুর রহমানের। প্রত্যেকেই টিভি মনিটরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে পর্যবেক্ষণ করছিলেন থানার ভেতর ও বাইরের পরিস্থিতি। কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে বিশেষ কিছু দায়িত্ব রয়েছে সাইদুর রহমানের। এ কাজেই তাঁর কাছে এসেছেন গোপালগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান রাজীব। কথা প্রসঙ্গে তিনি সাইদুর রহমানকে জানান, তাঁর ইউনিয়নে বেশির ভাগ বিরোধই পরিষদের গ্রাম আদালতে বসে মীমাংসা করা হয়ে থাকে। এ কারণে মামলা নেই বললেই চলে। মারামারির একটি ঘটনায় সম্প্রতি গ্রাম আদালতে ভুক্তভোগী এক ব্যক্তিকে ৪০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। পরিদর্শক সাইদুর রহমান জানান, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পরিদর্শক (তদন্ত) হোসেন আল মাহবুব জানান, সদর থানা এলাকায় ২০১৭ সালে কোনো ডাকাতি মামলা হয়নি। খুনের ঘটনা ঘটেছে একটি। অন্যান্য মামলার সংখ্যাও অনেক কমে গেছে।

রাত ১০টায় আলোকদিয়া থেকে সজল খন্দকার নামে এক যুবক এসে জানান, তাঁর ভাই স্বপন খন্দকারের ঘর থেকে একটি সংঘবদ্ধ চোরচক্র কিছুদিন আগে ১০ ভরি সোনা চুরি করে নিয়ে গেছে। সে বিষয়ে থানায় দেওয়া অভিযোগের খোঁজ নিতে এসেছেন তিনি। তদন্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সন্দেহভাজন লোকজনের গতিবিধি খেয়াল করতে এবং তেমন কিছু পেলে জানাতে বলেন।

এ প্রসঙ্গে জানা গেল, ১৫ দিনের মধ্যে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিভিন্ন দোকানসহ কয়েকটি বাড়িতে চুরি হয়েছে। এটি শহরবাসীর প্রধান সমস্যা এখন। কয়েক দিন আগে প্রকাশ্যে চুরি হয়েছে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শম্পা বসুর এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম বাবুল ফকিরের বাড়িতে। এ নিয়ে বিব্রত পুলিশ।

কথা প্রসঙ্গে সদর থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন জানান, এসব ঘটনার দুটি সংঘবদ্ধ চোরচক্রকে ধরা হয়েছে। এদের একটির দলনেতা মহসীন, অন্যটির মিলন। চক্রের সদস্যদের বাড়ি শহরতলির নিজনান্দুয়ালী, পারনান্দুয়ালী ও ফরিদপুরের মধুখালীতে। ধরা পড়লেও এরা কয়েক দিনের মধ্যেই জামিন পেয়ে যায়। ওসি বলেন, ‘মহসীন নামে যে চোরচক্রের হোতাকে ধরা হয়েছে, সে খুব সাংঘাতিক। কিভাবে জামিন পেয়ে যায় বুঝতে পারি না। সে জেলে থাকলে চুরি থেমে যায়। বাইরে থাকলে আবার চুরি করে। অথচ এরা সবাই আত্মস্বীকৃত চোর।’ তিনি জানান, জেলায় ৫৫ জন মোটরসাইকেল চোর আছে।

রাত সাড়ে ১০টায় শিবরামপুর থেকে মাদক সেবনের অভিযোগে মানস ও স্বপন নামের দুজনকে নিয়ে থানায় ঢোকে পুলিশের একটি দল। দুজনকে ঢোকানো হলো থানাহাজতে। রাত ১১টা থেকে নৈশ অভিযানে বেরোতে শুরু করে পুলিশের এক একটি দল।

রাত আড়াইটায় কক্ষ ছেড়ে নিজ নিজ বাসায় ফেরেন ওসি এবং দুই পরিদর্শক। অল্প কয়েকজন পুলিশ সদস্য তখন থানায়। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সদর থানার ডিউটি অফিসার তাইজুল ইসলাম জানান, সোমবার ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচজন আটক হয়েছে।



মন্তব্য

ALIM commented 23 days ago
“পুলিশের আক্ষেপ, ধরলেই বলে নেতার সঙ্গে কথা বলেন”, অপ্রিয় সত্য, পুলিশ বন্ধি নেতার ফোনে, নীরহ জনগনের কান্না কেউ না শুনে ৷আইন হচ্ছে আকাশের মত, রং বদলায় যত্রতত্র ৷