kalerkantho


সমঝোতা সত্ত্বেও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয়

মেহেদী হাসান   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সমঝোতা সত্ত্বেও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয়

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও তা অস্বীকার করে রীতিমতো দায়মুক্তি পেয়ে আসছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। রাখাইনে তাদের সহযোগী নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা এখনো রোহিঙ্গাদের ওপর সংক্ষুব্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন থেকে পালানো ছয় লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা গণহত্যা থেকেই বেঁচে গেছে বলে মনে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। গত মঙ্গলবারও রাখাইনে দাঙ্গায় সাতজন নিহত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমঝোতা সত্ত্বেও কতটা নিরাপদে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হবে তা নিয়েই জোর সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সমঝোতাকে অগ্রগতি বললেও ঝুঁকির বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন না।

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়েই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছে। বিশ্বকে মিয়ানমার দেখাতে চাচ্ছে যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তারা আন্তরিক। কিন্তু কয়েক মাস আগে যে দেশটি নিজের লোকদের অস্বীকার করে নির্যাতন-নিপীড়ন করে তাড়িয়ে দিয়েছে, রাতারাতি ওই দেশ নিজেকে শুধরে নিয়েছে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং ইতিহাসের শিক্ষা হলো, মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা যায় না। অতীতেও তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়েছে। আবার কয়েক দিন পর নানা ছুতোয় তাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে নেপিডোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) বৈঠকে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেওয়া পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হক গতকাল বুধবার ঢাকায় ফিরে বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই একটি বিশাল অর্জন। এটি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করবে।

তিনি আরো জানান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে যুক্ত করতে মিয়ানমার রাজি হয়নি। তবে ওই দেশটি রেড ক্রসের সহযোগিতা নিতে রাজি। প্রথম সপ্তাহে এক হাজার ৫০০  করে রোহিঙ্গা ফিরলেও পরে এ সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং দুই বছরেই সবার ফেরার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, তিন মাস পর পর জেডাব্লিউজি পর্যালোচনা বৈঠক করবে। জেডাব্লিউজির পরবর্তী বৈঠক আগামী ফেব্রুয়ারি বা মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করালেও, আপাতত তথ্য যাবে পরিবার হিসেবে। সে ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের সাহায্য নেবে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরো খরচ বহন করবে মিয়ানমার। প্রথম দফায় ফেরত যাবে জিরো পয়েন্টে থাকা সাত হাজার রোহিঙ্গা।

বিবিসি বাংলা গত রাতে এক প্রতিবেদনে বলেছে, মিয়ানমারে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার পরও প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়ায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে উদ্বেগ জানিয়েছে তা নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রসচিব বিবিসিকে বলেন, ‘মিয়ানমার সম্মত হয়েছে যে সেখানে বাড়িঘর করার পর তাদের আমন্ত্রণে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ যাবে ও পরিস্থিতি দেখবে। এসব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে লিখিতভাবে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছে। এগুলো ধাপে ধাপে হবে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির দায়িত্ব নিয়েছে। তারা সেটি করলে আমরা দেখব। এরপর রোহিঙ্গারা এখান থেকে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অনেকেই ফিরে যেতে চায়। তারা যাতে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা করব।’

এদিকে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আগামী ২৩ জানুয়ারিই ৫০৮ জন হিন্দু ও ৭৫০ জন মুসলমান রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। ওই এক হাজার ২৫৮ জনের তালিকা মিয়ানমার গত সোম ও মঙ্গলবার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) বৈঠকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

ওই বৈঠকে কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) তত্পরতা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ নভেম্বর নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর মধ্যে বৈঠকে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) এক হাজারেরও বেশি ‘আরসা জঙ্গি’র তালিকা দিয়েছে।

গত মঙ্গলবার নেপিডোতে পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে জেডাব্লিউজি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে ৩০০ জন করে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গত মঙ্গলবার রাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমঝোতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের আন্তর্জাতিক মান সমুন্নত রাখতে ইউএনএইচসিআরকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি।’

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়া অপরিহার্য। রোহিঙ্গাদের নিজেদের বাড়িঘরে ফেরার সুযোগ দিতে হবে, শিবিরে রাখা চলবে না।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার যে পরিকল্পনা করেছে তাতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার সীমান্তে ঢোকার পর দুই দফায় শিবিরে অন্তত কয়েক মাস অবস্থান করতে হবে। তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য নতুন করে আবেদন করতে হবে। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দুই বছরের সময়সীমার চেয়েও তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। রোহিঙ্গারা নিরাপদ বোধ না করলে তাদের জোর করে সীমান্তের বাইরে ঠেলে দেওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।

প্রত্যাবাসন শুরুর মতো পরিবেশ রাখাইনে সৃষ্টি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হিদার নোয়ার্ট বলেছেন, তাঁদের কাছে মাঠপর্যায়ের কোনো সমীক্ষা নেই। তবে রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং এখন ফেরানোর উদ্যোগ—এ দুইয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান বেশ কম। এই মুহূর্তে কেউ তাদের বাড়িঘরে ফিরতে আগ্রহী হবে, এমনটি তিনি ভাবতে পারছেন না।

হিদার নোয়ার্ট গত নভেম্বর মাসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, তাঁর মনে হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে রাজ্যে গত বুধবার পুলিশের গুলিতে বহু রাখাইন বৌদ্ধ হতাহত হওয়ার পর সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি ঢাকায় : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সাত দিনের আনুষ্ঠানিক বাংলাদেশ সফর শুরু করছেন মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লি। মিয়ানমারের অং সান সু চির সরকার তাঁকে সহযোগিতা করতে এবং দেশে ঢুকতে দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তিনি তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সফর করবেন।

ইয়াংহি লি আগামী ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ড যাবেন এবং ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই দেশ সফর করবেন। জানা গেছে, লি তাঁর বাংলাদেশ সফরের বেশির ভাগ সময় কাটাবেন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে।


মন্তব্য