kalerkantho


শীতের কামড়ে স্থবির দেশ

♦ যোগাযোগে বিপর্যয়
♦ আগুনে পুড়ে ১০ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতের কামড়ে স্থবির দেশ

ফাইল ছবি

এবার পৌষের শেষ সপ্তাহের তীব্র শীত মাঘে পা দিয়েও কামড় দেওয়া ছাড়েনি। গতকাল রবিবার মাঘের প্রথম দিনেও শীতের তীব্রতায় দেশজুড়ে জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। বিমান থেকে শুরু করে নৌ, বাস, লঞ্চ চলাচলে দেখা দেয় বিপর্যয়। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ফেরি চলাচল। যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। সারা দেশে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা কাবু হয়ে পড়ে। শীতে থরথর নওগাঁর বদলগাছীতে গতকাল তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছিল। রাজধানীতে দুপুরের আগে সূর্যের আলো তেমন দেখা যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শীতের তীব্রতা শিগগিরই কমছে না। গত কয়েক দিনে শীত থেকে রক্ষা পেতে আগুন পোহানোর সময় দগ্ধ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধাও আছেন। 

বিমান ওঠানামায় বিলম্ব : ঘন কুয়াশার কারণে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে বিমান পরিচালনায় হিমশিম খেতে হয় গতকাল। টানা সাড়ে ১১ ঘণ্টা ফ্লাইট ওঠানামার শিডিউলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়। বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে মানুষের ঢলের কারণে সৃষ্ট যানজটও এই বিপর্যয়ে প্রভাব ফেলেছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে হাজার হাজার যাত্রীকে। বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত কোনো ফ্লাইট সময়মতো ওঠানামা করতে পারেনি। এ সময়ে ২৩টি ফ্লাইট শিডিউলে বিঘ্ন ঘটে। এরই মধ্যে বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যখন একের পর এক ফ্লাইট অবতরণ করতে শুরু করে তখন দেখা দেয় এয়ারফিল্ডে স্থান সংকট। এক ঘণ্টার মধ্যেই গোটা বিমানবন্দরের এয়ারসাইট ভরে যায় উড়োজাহাজে। বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে ছিল হাজারো যাত্রী ও তাদের সঙ্গে আসা লোকজন।

 

প্রায়ই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ফেরি

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশার কারণে দেশের ব্যস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে দীর্ঘ সময়জুড়ে ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকছে। মাত্র তিন কিলোমিটারের ওই নৌপথ পাড়ি দিতে ঘাটে এসে আটকে পড়ে থাকছে বিভিন্ন গাড়ি। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। গতকাল রবিবার ফের ঘন কুয়াশার কারণে ভোর সাড়ে ৪টা থেকে টানা সাত ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ ছিল। এ নিয়ে চলতি শীত মৌসুমের বিভিন্ন সময় ঘন কুয়াশায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে মোট ৮৬ ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকল। এতে প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব আয় (ফেরির টিকিট বিক্রি) থেকেও বঞ্চিত হয়েছে বিআইডাব্লিউটিসি।

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, টার্মিনালের বিশাল পার্কিং ইয়ার্ড বিভিন্ন ট্রাক ও লোকাল বাসে ভরে আছে। ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ বাজার পদ্মার মোড় পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার রাস্তায় দীর্ঘ যানজট। বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে আসা ঢাকার সাভারগামী চালবোঝাই এক কাভার্ড ভ্যানের চালক সুলতান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে দৌলতদিয়া ঘাটে আসার পর আমার গাড়িটি ট্রাকের দীর্ঘ সিরিয়ালের পিছে পড়ে। পরে ওই রাতেই আমার গাড়ি টার্মিনালে নিয়ে আটকে রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আজ (গতকাল) দুপুর হয়ে এলেও আমার গাড়ি টার্মিনালেই আটকে আছে।’ গতকাল ভোর সাড়ে ৪টা থেকে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভাষাশহীদ বরকত, খানজাহান আলী, ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা, কেরামত আলী, হাসনাহেনা ও কপোতী নামের ছয়টি ফেরি নৌপথের মাঝনদীতে আটকে পড়ে থাকে। এ নিয়ে চলতি শীত মৌসুমের বিভিন্ন সময় ঘন কুয়াশায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে মোট ৮৬ ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকল।

বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফের ঘন কুয়াশার কারণে রবিবার টানা সাত ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ ছিল। তাই দৌলতদিয়া ঘাটে গাড়িগুলো আটকে পড়েছে। বর্তমানে ছোট-বড় মোট ১৬টি ফেরি সার্বক্ষণিক সচল রেখে গাড়িগুলো দ্রুত পারাপার করা হচ্ছে।’ শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে গতকাল সাড়ে চার ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম শাহ খালেদ নেওয়াজ জানান, রবিবার ভোর ৬টা থেকে পদ্মা অববাহিকায় ঘন কুয়াশা নেমে আসে। কুয়াশার চাদারে ঢাকা পড়ে নৌ রুট। কুয়াশার ঘনত্ব এতই বেশি ছিল যে খুব কাছের কোনো জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। দুর্ঘটনা এড়াতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, শহরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ ও গাড়িগুলো ঘন কুয়াশার কারণে অনেক দেরিতে পৌঁছাচ্ছে। প্রচণ্ড শীতে অসহায় হয়ে পড়েছে দিনমজুররা। পাবনা থেকে আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানান, জেলার বেড়া উপজেলায় শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষের কষ্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অসহায় এসব শীতার্তের মধ্যে সরকারিভাবে কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। বেড়া উপজেলায় যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে বসবাস করে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ২০ বছর ধরে যমুনা নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নেওয়া বেশির ভাগ পরিবারের বসতঘর ভাঙাচোরা। এতে নদীর দিক থেকে হিমেল হাওয়া এসে ঘরে ঢোকে।

আগুনে গেল ১০ প্রাণ : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রাম সদরের ডাকুয়া কৃষ্ণপুর গ্রামের বাড়িতে বৃহস্পতিবার দুপুরে আগুন পোহাচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ওসমান আলী। একসময় তাঁর গায়ের চাদরে আগুন লেগে তিনি দগ্ধ হন। পরে তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালের উদ্দেশে নিয়ে আসার সময় পথেই মারা যান তিনি। তীব্র শীত থেকে রক্ষা পেতে আগুন পোহাতে গিয়ে সারা দেশে গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ মারা গেছে। এর মধ্যে রংপুরে মারা গেছেন পাঁচজন, ভোলায় একজন ও কুড়িগ্রামে একজন।

শুক্রবার ভোলার বোরহানউদ্দিনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আফিফা খাতুন (৫৫) দুপুরে গোসল করে কাঁপুনি ধরলে চুলায় আগুন পোহাতে যান। তাঁর কাপড়ে আগুন লেগে তিনি অগ্নিদগ্ধ হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়। গতকাল তিনি মারা গেছেন। রংপুরে অনেকে খড়কুটো জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা মোকাবেলার চেষ্টা করছে। অনেকেই অসাবধানবশত এতে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

গত পাঁচ দিনে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো মারা গেছেন মনি বেগম (৭৫), খোরশেদ আলম (৩), ফাইজন নেছা (৯৯), শাম্মি আক্তার (১৩) ও ফাতেমা বেগম (৫০)। এদের শরীরের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।

এ ছাড়া ঢাকা গতকাল মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা গেছে তিনজন। এরা হলো চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার খাদিজা বেগম (৩০), গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার লোকজান বেগম (৬০) এবং আশুলিয়ার সাবিনা (৮)।



মন্তব্য