kalerkantho

সবিশেষ

সেই চিঠির ১২০ বছর

হানযালা হান   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সেই চিঠির ১২০ বছর

১৩ জানুয়ারি, ১৮৯৮। অখ্যাত ফরাসি দৈনিক ল্য আরোরে একটি খোলা চিঠি ছাপে। প্রথম পাতাজুড়ে শুধু একটি চিঠি! আর কোনো সংবাদ নেই। আট কলামজুড়ে শিরোনাম, ‘জ্য অ্যাকিউজ...!’ (আমি অভিযোগ করছি)। চিঠিটি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ফেলিক্স ফ্রাঁসোয়া ফরা বরাবর লেখা। লেখক : ঔপন্যাসিক এমিল জোলা। ফ্রান্সজুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল। পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। সেদিনের পত্রিকা শেষ পর্যন্ত প্রচার হয়েছিল প্রায় তিন লাখ কপি। পত্রিকাটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সরকারপ্রধানের টনক নড়ে। আজ সেই চিঠি প্রকাশের ১২০ বছর পূর্তি।

চার হাজার পাঁচ শ শব্দের চিঠিটি আলফ্রেড ড্রেফুসকে নিয়ে। তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কর্মকর্তা। জাতিতে অ্যালসেশিয়ান, ধর্মে ইহুদি। গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে ফরাসি আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ছোট্ট দ্বীপে। চিঠিতে ড্রেফুসের বিরুদ্ধে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন সবার নাম ছাপা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিলেন যুদ্ধমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানও। ঘটনার শুরু এক টুকরা কাগজে অস্বাক্ষরিত তারিখবিহীন অনানুষ্ঠানিক একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে। যে চিঠি ১৮৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেখা হয়েছিল প্যারিসের দূতাবাসে সংযুক্ত জার্মান সেনা কর্মকর্তাকে। এতে ফরাসি সেনাবাহিনীর বিদেশি অভিযান সম্পর্কে গোপন তথ্য ছিল। তদন্তে ড্রেফুসকে সন্দেহ করা হয়। শুরুর দিকে তাঁর ধর্মের চেয়ে জাত নিয়ে সন্দেহ বাড়ে। কারণ, অ্যালসেশিয়ানরা ভাষা ও সংস্কৃতিতে জার্মান ছিল। তাঁর হাতের লেখার সঙ্গে চিঠির পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সম্ভাব্য লেখক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। সামরিক বাহিনীর চাপে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। এক সেনা কর্মকর্তা একটি রিভলভার রেখে তাঁকে আত্মহত্যার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি তখন বলেন, ‘নির্দোষ প্রমাণের জন্য আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।’

অন্যদিকে ড্রেফুসকে অপরাধী সাব্যস্তের নেপথ্যে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জর্জেস পিকার্ট গুপ্তচরবিরোধী শাখার প্রধান হন। ১৮৯৬ সালে জার্মান দূতাবাসকে লেখা আরেকটি চিঠি তাঁর হাতে এসে পড়ে। এর সঙ্গে আগের চিঠির হাতের লেখা ছিল হুবহু। এটা দেখে পিকার্ট বিস্মিত হন। তিনি গোপন তদন্তে জানেন, এর লেখক ফার্দিনান্দ ওয়ালসঁ এস্টারহাজি। পিকার্ট সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরাতে যথাসম্ভব সব কিছু করে। কারণ, এই ঘটনার বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে। আদালত ‘ভুল বিচার’ কথাটা স্বীকার করতে চাচ্ছিল না। পিকার্টকে তিউনিসিয়ায় বদলি করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলাও হয়।

১৩ জানুয়ারিতে জোলার খোলা চিঠি প্রকাশের পর পুরো দেশের লেখক, শিল্পী, পেশাজীবী, চিন্তাবিদরা দুই ভাগে বিভক্ত হন। ১৫ জানুয়ারিতে ১৫ জন ‘আঁতেলেকচুয়াল’ তথা বুদ্ধিজীবীর লেখা পুনর্বিচারের দাবিসংবলিত একটি লেখা ছাপা হয় ল্য টেম্পস পত্রিকায়। ফরাসিরা নতুন এক শব্দের সঙ্গে পরিচিত হন, বুদ্ধিজীবী। জোলার বিরোধীরাও এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধমন্ত্রী তাঁর সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ আনেন। তিনি জোলার বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

এদিকে এস্টারহাজি স্বীকার করেন, তিনিই লেখক। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা এবার পুনর্বিচার এড়াতে পারলেন না। তাঁকে সামরিক আদালতে তোলা হয়। বাহিনী তাঁকে চাকরির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে। তিনি যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান। অন্যদিকে ড্রেফুসকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি চাকরিও ফিরে পান। ১৯০৭ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।

ল্য আরোরে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এমিল জোলা ও সাংবাদিক জর্জ ক্লেমেসোঁ। ক্লেমেসোঁ পরে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। আর এমিল জোলা ফরাসি প্রকৃতিবাদী কথাসাহিত্যের উদ্গাতাদের একজন। যিনি বরাবর প্রভাবশালীদের অনিয়মকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চোখ-রাঙিয়েছেন। এরই নমুনা এই চিঠি। ছোটখাটো ভুল থাকলেও সেই চিঠি আজ ইতিহাস। যাকে বলা হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অভ্যুত্থান।

 



মন্তব্য