kalerkantho


মৌলভীবাজারের দুই রাজাকারের ফাঁসি, আমৃত্যু জেল তিনজনের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মৌলভীবাজারের দুই রাজাকারের ফাঁসি, আমৃত্যু জেল তিনজনের

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার দুই রাজাকারের ফাঁসি ও তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের ৩০তম মামলার রায় এটি।

এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগে মো. নেছার আলী (পলাতক) ও উজের আহমেদকে (কারাবন্দি) সর্বোচ্চ শাস্তি  মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগটি ছিল, মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় সুশীতল ধরদের বাড়িতে ধর পরিবারের লোকজনসহ ১৪ জনকে হত্যার মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার অপরাধ। অপর তিনজন সামছুল হোসেন তরফদার ওরফে আশরাফ, ইউনুছ আহমেদ, মোবারক মিয়াকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য ধারাগুলোতেও তাঁদের সাজা হয়েছে, একজন শুধু একটি অভিযোগে খালাস পেয়েছেন।

রায় ঘোষণার সময় কারাবন্দি থাকা ইউনুছ ও উজের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি তিনজন মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই রাজাকার নেছার আলী ও উজের আহমেদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। তবে তাঁরা চাইলে ৩০ দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন। পলাতকরা আপিল করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেপ্তারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।

রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন। আসামিদের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেছেন, গ্রেপ্তার থাকা দুজন রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

দণ্ডিত পাঁচ রাজাকারের সবাই মোটামুটি বয়স্ক। তাঁদেরকে দণ্ড প্রদানের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। রায় ঘোষণার পর আদালতের পর্যবেক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, ‘রায় ঘোষণার সময় আদালত দুটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাত্তরের ইতিহাস জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে উঠে আসে। দ্বিতীয়ত, দুটি ট্রাইব্যুনালে যখন মানবতাবিরোধীদের বিচার চলত তখন আসামিদের বয়স বিবেচনা নিয়ে কিছু মতভেদ ছিল। তবে মানবতাবিরোধীদের অপরাধ এতটাই ঘৃণ্য যে বিচারের ক্ষেত্রে আসামির বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর কারণ হতে পারে না।’

এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে এক নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুই নম্বর অভিযোগে নেসার, ইউনুস ও উজেরকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ইউনুসকে খালাস দেওয়া হয়েছে। চার নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর এই পাঁচজনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই দিনই রাজনগর থানার গয়াসপুর গ্রামের উজের আহমেদ চৌধুরী ও সোনাটিকি গ্রামের মৌলভি ইউনুছ আহমদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৪ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ২৭৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিদের মধ্যে শামসুল হোসেন তরফদার একাত্তরে আলবদর বাহিনীর এবং নেছার আলী রাজাকার বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন। অন্যরা এই দুইজনের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ওই বছরের ২৬ মে তাঁদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট এবং আটকে রেখে নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগসংবলিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর মামলার বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর ২০ নভেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।



মন্তব্য