kalerkantho


উদ্যোগ

জাতীয় জিন ব্যাংক গড়ছে সরকার

আবুল কাশেম   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয় জিন ব্যাংক গড়ছে সরকার

এভাবেই সংরক্ষণ করা হবে বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের জিন।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ, অণুজীব, কীটপতঙ্গ এবং সামুদ্রিক অণুজীবের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে জেনেটিক রিসোর্সের স্পার্ম ব্যাংক গড়ে তোলা হবে, যা ‘জাতীয় জিন ব্যাংক’ নামে পরিচিতি পাবে। প্রাণিসম্পদ, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদকুলের জিন সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতে এদের বিলুপ্তির শঙ্কা থাকবে না। গবেষণার মাধ্যমে এদের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এনে মানুষের জন্য অধিকতর কল্যাণকর বিবেচনায় প্রজনন করানো সম্ভব হবে।

জিন ব্যাংক থেকে জেনেটিক রিসোর্স ও এ সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে গবেষণা করবেন সরকারি ও বেসরকারি গবেষকরা। এর মাধ্যমে অধিক উৎপাদনশীল, পীড়নসহিষ্ণু, কীটপতঙ্গ ও রোগজীবাণু প্রতিরোধী, দ্রুত বর্ধনশীল নতুন নতুন জাত বা স্ট্রেইন উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে গবেষণাকাজে বেসরকারি খাতে এরই মধ্যে বেশ কিছু জিন ব্যাংক গড়ে উঠেছে। তবে এসব জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত জেনেটিক উপাদানগুলোর কোনো ব্যাকআপ নেই। ফলে কোনো কারণে সংরক্ষিত সম্পদগুলো নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনরায় সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ প্রেক্ষাপটেই জাতীয়ভাবে জিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অণুজীবের বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্যই জিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জিন ব্যাংকে উদ্ভিদ, প্রাণী, মত্স্য, অণুজীব, কীটপতঙ্গ, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, বনজ ও মনুষ্য কৌলিসম্পদ (জেনেটিক রিসোর্সেস) কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হবে।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বে বিখ্যাত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা জাতের সঙ্গে ক্রস করার ফলে আসল ব্ল্যাক বেঙ্গল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে। ব্ল্যাক বেঙ্গলের জিন সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা এ জাতের বিলুপ্তি ঠেকাতে পারি। সংরক্ষিত জীন থেকে যেকোনো সময়ই আবার একই মানের ও জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গল পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া যেকোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর জিন সংরক্ষণের পর গবেষণার মাধ্যমে এর মধ্যে থাকা ক্ষতিকর কোনো বৈশিষ্ট্য কমিয়ে মানুষের জন্য উপকারী উপাদানগুলো বাড়ানোর মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রাণীর জেনেটিক রিসোর্সগুলো জীববৈচিত্র্যের একটি অংশ। প্রাণিসম্পদ, হাঁস-মুরগি ও মত্স্যসম্পদ সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং কার্যকর ব্যবহারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এদের বিভিন্ন প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য নির্ণয় ও মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট, দেশি মেষ, মহিষ, রেড চিটাগং ক্যাটল, পাবনা ক্যাটল, মুন্সীগঞ্জ ক্যাটল, অন্যান্য দেশি গরু, নেকেড নেক মুরগি, হিলি মুরগি, আসিল মুরগি, নাগেশ্বরী হাঁস, অন্যান্য দেশি প্রজাতির হাঁস, উদ্ভাবিত মিউল হাঁস, রাজহাঁস, কবুতর, কোয়েল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাত। বিভিন্ন প্রকারের স্বাদু পানির ও সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদ বাংলাদেশের মূল্যবান জিনগত সম্পদ। ভবিষ্যতে মানুষের কল্যাণে এসব জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণ করা জরুরি। ফ্রায়োপ্রিজারভেশন পদ্ধতিতে (১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তরল নাইট্রোজেন) প্রাণিসম্পদ এবং হাঁস, মোরগ-মুরগি ও মত্স্যসম্পদের সিমেন ও ডিম্বাণু সংরক্ষণ একটি কার্যকর পদ্ধতি। একই সঙ্গে ফিল্ড জিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব জেনেটিক রিসোর্স তাদের আবাসস্থলেও সংরক্ষণ করা জরুরি।

প্রকৃতিতে ব্যাপ্ত অণুজীবগুলো দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। বিভিন্ন অণুজীবকে মূল্যবান ওষুধ, এনজাইম, মেটাবলোলাইটস, খাদ্য উৎপাদন, জীব প্রযুক্তি, বর্জ্য নিরীজন ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়। মাটির উর্বরা শক্তি বজায় রাখা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ডায়াগনস্টিক উৎপাদন, বিভিন্ন ওষুধ, কীটনাশক ও জীবাণুনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষায় অণুজীবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া বিভিন্ন কীটপতঙ্গ পোলিনেটর, মাটির কন্ডিশনার ও প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ ফুল উৎপাদনকারী উদ্ভিদের পরাগায়ণ সম্পন্ন করে কীটপতঙ্গের মাধ্যমে। এক-তৃতীয়াংশ শস্য উৎপাদন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কীটপতঙ্গ দ্বারা পরাগায়ণের ওপর নির্ভর করে। তাই কীটপতঙ্গ সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান আগ্রহের বিষয়বস্তু। মেডিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা অসীম। জেনেটিক বৈচিত্র্যই সামুদ্রিক সম্পদের মূল্যের মূল কারণ। গভীর সমুদ্রে পাওয়া জেলি মাছ থেকে গ্রিন ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন (জিএফপি) পাওয়া যায়, যা একবিংশ শতাব্দীর মাইক্রোস্কোপ নামে পরিচিত। বর্তমানে এই জিএফপি একটি জৈবিক হাইলাইটার হিসেবে বিভিন্ন গবেষণা, রোগ নির্ণয়, ক্যান্সারের ঝুঁকি নির্ণয়, এইডস ভাইরাস এবং নানা ধরনের জীবাণুর আক্রমণ বা বিস্তার পদ্ধতি নির্ণয়সহ অনেক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায়ও সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদের সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।



মন্তব্য