kalerkantho


পরিবেশ

সেন্ট মার্টিনসের দুই ‘বন্ধু’

আরিফুর রহমান, সেন্ট মার্টিনস থেকে ফিরে   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সেন্ট মার্টিনসের দুই ‘বন্ধু’

সৈকতের বর্জ্য পরিষ্কার করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সৈকতজুড়েই প্যাকেট আর প্যাকেট। খাবার, সিগারেট, চকোলেট, চিপস—কিসের প্যাকেট নেই! ডাব, স্ট্র, পলিথিন ব্যাগ, বোতল, স্যান্ডেল, জালের টুকরা, ফোমের মতো অপচনশীল দ্রব্যেরও ছড়াছড়ি। সমুদ্রের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এই সবই মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। অথচ সেন্ট মার্টিনসের উপকূলে যত্রতত্র এসবের ছড়াছড়ি। পর্যটকরা যখন বেপরোয়া, যখন তারা দায়িত্বহীনভাবে এটা-সেটা ফেলছে, ঝুঁকিতে ফেলছে সেন্ট মার্টিনসকে, তাদের সচেতন করতেই এগিয়ে এসেছে দুটি সংগঠন। প্রতীকী অভিযান হিসেবে বছরে একবার তারা পাঁচ বর্গকিলোমিটার এলাকার এই দ্বীপে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ ডিসেম্বর কোকা-কোলা বাংলাদেশ ও কেওক্রাডং বাংলাদেশ যৌথভাবে টানা সপ্তমবারের মতো সেন্ট মার্টিনস পরিষ্কার করার অভিযান চালায়। সমুদ্রসৈকত থেকে আবর্জনা অপসারণে তাদের সহযোগিতা করে ৫৫০ স্বেচ্ছাসেবক। স্থানীয় জিনজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেড়াতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ পেশাজীবীরা ওই দিন ৮০০ কেজি ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করেন দ্বীপের চারপাশ ঘুরে।

দুই সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেছেন, পর্যটকরা যাতে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করে তুলতেই তাঁদের এই উদ্যোগ। সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে সমুদ্রদূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলেও মনে করেন তাঁরা। কোকা-কোলা থেকে জানানো হয়েছে, গত সাত বছরে কোকা-কোলা বাংলাদেশ ও কেওক্রাডং বাংলাদেশ-এর সহায়তায় সাড়ে তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবী সেন্ট মার্টিনস থেকে আট হাজার ৪০০ কেজি আবর্জনা পরিষ্কার করেছে।

কোকা-কোলা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনসের সৌন্দর্য অকল্পনীয় এবং এর ফলে সেখানে পর্যটকরা যেতে আকৃষ্ট হয়। এটি অনেক সময় সেখানকার সংবেদনশীল ইকো সিস্টেমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সাত বছর ধরে পর্যটক, স্থানীয় জনগণ এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আমরা কোস্টাল ক্লিনআপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। আশা করি, এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুত দূষণমুক্ত পানি, সবুজ, পরিষ্কার ও টেকসই পরিবেশের অঙ্গীকার পূরণে সক্ষম হব।’

সংগঠন দুটিকে সহায়তা করছে ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিনআপ বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মুনতাসির মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত বছর ধরে এই পরিষ্কার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেছি, আগে যেসব ময়লা-আবর্জনা তুলতাম, সেগুলো এখন দেখা যায় না। তবে নতুন নতুন ময়লা দেখা যাচ্ছে। তার মানে হলো, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আগে যারা ময়লা ফেলত, তারা এখন ফেলছে না। সবার মধ্যে ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে।’ মুনতাসির মামুন অভিযোগ করে বলেন, সরকার এই দ্বীপকে শুধু ইসিএ ঘোষণার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম শেষ করেছে। পরিবেশ রক্ষায় তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। তাঁর মতে, সমুদ্র বাঁচাতে হলে সবার অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। অপচনশীল প্লাস্টিক সৈকতে ফেললে পরিবেশের ক্ষতি হবে, প্রবাল মারা যাবে, কচ্ছপের প্রজননে সমস্যা হবে। পর্যটক ও স্থানীয় মানুষকে বিষয়টি বোঝানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের ফুসফুস হলো প্রবাল। এ জন্য জনপ্রতিনিধি, সরকারি সংস্থা ও হোটেল মালিকদেরও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই কেবল সমুদ্রকে পরিষ্কার রাখা সম্ভব হবে।’

সেন্ট মার্টিনস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত; বাইরে থেকে দুটি সংগঠন এসে আমাদের এলাকা পরিষ্কার করে দিয়ে যাচ্ছে। এটি তো আমাদেরই করা উচিত। কারণ আমরাই এই দ্বীপে বসবাস করি। আমরাই দ্বীপে ময়লা ফেলি।’ তিনি আরো বলেন, ‘দ্বীপকে অপরিষ্কার করার মূল কারণ স্থানীয়দের মধ্যে অসচেতনতা। একই সঙ্গে যারা পর্যটক তাদের মধ্যেও অসচেতনতা রয়েছে। আমরা হোটেল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্বীপে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। হোটেল মালিকদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাইনি। সবার মধ্যেই বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনা। শুধু টাকা আয়ের চিন্তা সবার মধ্যে। দ্বীপকে বাঁচানোর কোনো চিন্তা তাদের মধ্যে নেই।’



মন্তব্য