kalerkantho


বাণিজ্য মেলা

ছুটির দিনে জমজমাট

এম সায়েম টিপু   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছুটির দিনে জমজমাট

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বাণিজ্য মেলায় ছিল উপচে পড়া ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরাবরের নিয়ম ধরে জানুয়ারির প্রথম দিনেই দরজা খুলেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। কিন্তু তেমনভাবে আলোচনায় আসছিল না। অবশেষে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসে তা জমে উঠল। গতকাল শুক্রবার পঞ্চম দিনে এসে সত্যিকারের মেলার রূপ পেয়েছে ২৩তম এই মাসব্যাপী আয়োজন।

গতকাল সকাল থেকে নগরবাসীর উল্লেখযোগ্য একটা অংশের স্রোত ছিল শেরেবাংলানগর অভিমুখী। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মেলায় জনসমাগম। বিশেষত বিকেলের দিকে তা যেন জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আগতরা বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। এরপর ছড়িয়ে পড়ে মাঠজুড়ে।

বিশাল মাঠজুড়ে সাজানো-গোছানো স্টলগুলোতে শুধু মানুষ আর মানুষ। ক্রেতা-দর্শনার্থীরা এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরে ঘুরে হাজারো পণ্য দেখা ও কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় কাটায়। তুলনামূলক কম দামে ভালো পণ্যটি নিজের করে নিতে সবাই শশব্যস্ত। মেলায় সম্পূর্ণ ডিজিটাইজড বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়নটিতে দর্শনার্থীর লক্ষণীয় ভিড় দেখা গেছে। সেখানে রয়েছে ৩৬০ ডিগ্রি ইনসাইডসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুর্লভ ছবি ও তাঁর জীবনের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র উপভোগের সুযোগ।

সরেজমিনে গতকাল মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দিকেই ক্রেতার আগ্রহ বেশি। এর মধ্যে মেয়েদের পোশাক, শাল,  প্রসাধনী, ক্রোকারিজ পণ্য, বিস্কুট, প্লাস্টিক পণ্য, শিশুদের খেলনা, ছেলেদের ব্লেজারের পসরা নিয়ে সাজানো স্টলগুলোতে দিনভর ভিড় লেগে থাকে। বিকিকিনিও হয়েছে বেশ।

রাজধানীর কাকরাইল থেকে পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছেন হাফিজুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেলায় একসঙ্গে অনেক পণ্যের আসর বসে। তাই স্ত্রীকে নিয়ে এলাম গৃহস্থালি কিছু পণ্য কেনার জন্য। তা ছাড়া কিছু কিনলে নগদ ছাড় আর উপহারের সুযোগটাও নিতে চাই। তবে যা কিনব মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে ঘুরে দেখেশুনেই কিনব।’ 

উত্তরা থেকে ছোট ভাই দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল মেলায় এসেছেন কাকলী সাহা। তিনি বললেন, ‘প্রতিবছরই মেলায় আসি। এবার এলাম প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কেনার উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে এবারের মেলায় বৈচিত্র্যপূর্ণ তেমন একটা কিছু দেখছি না। বরাবরের সেই প্লাস্টিক পণ্য, গতানুগতিক ক্রোকারিজ আর মেয়েদের শাল ও সাজসজ্জার পণ্যেই যেন থেমে আছে এই আয়োজন। তবে এখনই নিরাশ হচ্ছি না। ঘুরে ঘুরে দেখি। তারপর কেনার পালা।’

কাশ্মীরি শালের প্রতি আবহমান বাংলার মানুষের দুর্বলতা বরাবরের। তার প্রমাণ মিলেছে গতকালের মেলায়ও। শীত মৌসুমের এই আয়োজনে এদিন কাশ্মীরি শালের পসরা সাজিয়ে বসা স্টলগুলোতে বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় কাটায়। প্রতিবছরের মতো এবারের বাণিজ্য মেলায়ও প্রচুর স্টল রয়েছে এই শীতবস্ত্রের। এর বাইরে মেলার ২০৮ নম্বর স্টলে দেখা গেল চীনের নানা রঙের ছোট ছোট শাল। এগুলো বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। জানতে  চইলে স্টল কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানান, তাঁদের স্টলে কাশ্মীরি শালও রয়েছে। দাম এক হাজার ৪০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে।

পিছিয়ে নেই পাকিস্তানের সবজি ও মসলা তৈরির স্লাইসার আর ডাইসারের স্টল। বিক্রয়কর্মীরা ‘আলু ভাজি, মুলা ভাজি/অফিস টাইম, তাড়াতাড়ি’—এমন সব ছন্দে ছন্দে এসব ডাইস বিক্রি করছেন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়।

পোশাক হিসেবে তরুণ-তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে ব্লেজার। শীতে স্টাইলিশ আউটফিট হিসেবে ব্লেজারের কদরও রয়েছে বেশ। ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে মেলায় বাহারি স্যুট, কোট ও ব্লেজার এনেছে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান। মানভেদে এগুলোর দামেও রয়েছে বেশ পার্থক্য। এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন রং ও সাইজের ব্লেজার। আছে মেয়েদের ব্লেজারও। ক্রেতারাও বাছাই করে দোকানগুলো থেকে কিনে নিচ্ছে নিজের মাপের পোশাকটি। মেয়েদের আকর্ষণীয় থ্রি-পিস এনেছে দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘ড্রেস লাইন’সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

প্রতিবছরের মতোই এবারের মেলায়ও ছাড়ের হাঁকডাক রয়েছে। বেশ কয়েকটি স্টলে মাল্টি ফাংশনাল ডিজনি ইলেকট্রনিক ওভেন বিক্রি হচ্ছে। দাম দুই হাজার ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে আবার ক্রেতার পছন্দের ১০টি পণ্য মিলছে একেবারে বিনা মূল্যে। মেলায় পণ্যের বুকিং দিলেই বিনা মূল্যে তা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে কম্পানি।

ভারতের পেট্রন ব্র্যান্ডের রুটি মেকার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র দুই হাজার ২০০ টাকায়। মেলার প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন ৫২ নম্বরে মিলছে এই পণ্য। আরেক আকর্ষণ হাজির করেছে এসকে এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের স্টলে মাত্র ১৫০ টাকায় যেকোনো ক্রোকারিজ, স্কুল পণ্য আর শিশুদের খেলনা কেনার সুযোগ রয়েছে। এসব পণ্য পাওয়া যাচ্ছে ২৩০/আই স্টলে।

মেলায় বিভিন্ন মান ও ধরনের বিস্কুটের প্যাকেজ নিয়ে এসেছে প্রাণ, রোমানিয়া, নাবিস্কোর মতো দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান। এসব প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে ১০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে। স্টল কর্মকর্তারা জানান, এসব পণ্য খোলাবাজারের তুলনায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কম দামে মেলা থেকে কেনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রতিবছর এই মেলার আয়োজন করে আসছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকায় আগতদের কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। ক্রেতার স্বার্থ রক্ষায় তৎপর দেখা গেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকেও।

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক প্রণব কুমার প্রামাণিক কালের কণ্ঠকে জানান, গত পাঁচ দিনে মেলায় ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো ঘটনার অভিযোগ নেই বললেই চলে। সরেজমিনেও তেমন অনিয়ম বা প্রতারণা নজরে আসেনি। অবশ্য এ জন্য অধিদপ্তর আগে থেকেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তিনি জানান, এর পরও গত পাঁচ দিনে ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ছোটখাটো অনিয়মের জন্য প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।



মন্তব্য