kalerkantho


ঢাকায় সেমিনারে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

বাংলাদেশের তিন খাতের উন্নয়ন বিস্ময়কর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের তিন খাতের উন্নয়ন বিস্ময়কর

নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার যে উন্নয়ন ঘটেছে, তাকে ‘বিস্ময়কর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে তিনটি খাতের উন্নয়নে এই ‘বিস্ময়’ দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, সুশাসনের অভাবসহ নানা বিপত্তির পরও প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার যেভাবে বাড়ছে, তা বিস্ময়কর।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘রিবেজিং অ্যান্ড রিভিশন অব জিডিপি : বাংলাদেশ পার্সপেকটিভ’ শিরোনামের এক সেমিনারে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব কথা বলেন।

মাথাপিছু জাতীয় আয় কম হওয়ার পরও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সামাজিক সূচকগুলোতে যেভাবে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে, তা এখনো ধাঁধা মনে হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম হওয়ার পরও কিভাবে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, সেটিকেও বিস্ময় হিসেবে দেখছেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তবে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যে কিভাবে বাংলাদেশের এমন উন্নতি ঘটেছে সে রহস্য জানা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। মোট জিডিপির অনুপাতে যে হারে বিনিয়োগ হচ্ছে, তাতে প্রবৃদ্ধি এত হওয়ার কথা নয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বরকত ই খুদা, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জিয়াউল ইসলাম, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম প্রমুখ।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও যুক্তরাজ্যের আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস আর ওসমানি।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, ‘দেশে অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। গ্রামগঞ্জেও কলেজ দেখা যায়। তরুণ শিক্ষার্থীরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে চাকরি পাচ্ছে না। আমার কাছে অনেকে চাকরির জন্য আসে। কিন্তু তাদের জন্য কিছু করতে পারি না। তাতে দেখা গেছে, দেশে অনেক তরুণ-তরুণী পাস করেও বেকার।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতিবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে তথ্য দিচ্ছে, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মির্জ্জা আজিজ আরো বলেন, ‘জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগের কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাই না। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও তেমন গতি নেই। কাঁচামাল আমদানিও তেমন হচ্ছে না। তাহলে এত প্রবৃদ্ধি হয় কিভাবে?’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের মতে, দেশে কর্মসংস্থান বেড়েছে। গ্রামগঞ্জে অনেকে কাজে প্রবেশ করেছে। কিন্তু সেটি বিবিএসের জরিপে যোগ হয়নি। দেশের কারিগরি শিক্ষায় কিছু দুর্বলতা আছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনে কারিগরি শিক্ষায় পিপিপি ভিত্তিতে করা যেতে পারে। শিল্পায়নের মাধ্যমে জনসংখ্যার বোনাসকাল কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বরকত ই খুদা বলেন, ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যার বোনাসকালে প্রবেশ করেছে অনেক আগে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ মাত্র একবার এই সুযোগ পায়। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছে না। এতে করে জনসংখ্যার বোনাসকাল দুর্যোগে রূপ নিতে চলেছে। সরকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না।’

বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম বলেন, ‘২০১৩ থেকে ২০১৬ এই সময়ে দেশে কর্মসংস্থানের হার বাড়েনি। তবে এই সময়ে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার বেড়েছে।’ দেশে বিভাগওয়ারি জিডিপি নিরূপণ করার পরামর্শ দেন রুশিদান ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেসব দেশে বিনিয়োগ ছাড়াই প্রবৃদ্ধি হয়। মালয়েশিয়াতে মোট জিডিপির ২৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়। সে তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ অনেক বেশি। মন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়িয়েও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানো গেলে ২০১৯ সালের মধ্যেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। আর জনসংখ্যার বোনাসকাল নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমাদের তথ্য বলছে, ২০৬১ সাল পর্যন্ত আমরা এই সুযোগ হারাব না। ওই সময় আমাদের কর্মক্ষম মানুষের হার থাকবে ৬৫ শতাংশ।’

চাল ও পেঁয়াজের দাম বাড়ায় পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে সম্প্রতি যে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, দুটি আইটেম দিয়ে বলা যায় না যে পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এই দুটি পণ্য দিয়ে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ হয় না। তবে চাল ও পেঁয়াজের দাম বাড়ায় মানুষ কষ্ট পেয়েছে, এটা ঠিক। উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়ার পক্ষেও মত দেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

ড. মসিউর রহমান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও তথ্য নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, ‘বিবিএস ছোট প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সেখানে পরিচালক পদে কোনো পরিসংখ্যান কর্মকর্তা যেতে পারে না। অন্য ক্যাডার থেকে পাঠানো হয়। পরিচালক পদে বিবিএসের নিজস্ব জনবল দেওয়ার জন্য অনেক তদবির করেছি, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। পরিসংখ্যানের মান যদি উন্নয়ন করা না যায়, তাহলে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।’



মন্তব্য