kalerkantho


আ. লীগে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাকব বিএনপিতে নতুনের ‘হুমকি’

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাকব বিএনপিতে নতুনের ‘হুমকি’

ভোলা-৪ আসনে কোনো দলেরই একক আধিপত্য নেই। তবে পরপর দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত। দলের বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে দাবি করছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাজিমউদ্দিন আলম মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও আরো কয়েকজন প্রার্থী হতে চান। এ কয়েকজনের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমানে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন নিজের অবস্থান তৈরির পথে বেশ এগিয়ে গেছেন।

মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে ভোলার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলা নিয়ে ভোলা-৪ আসন। এটি জাতীয় সংসদের ১১৮তম নির্বাচনী এলাকা। এর মধ্যে মনপুরা জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম একটি উপজেলা। এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ জন।

উল্লেখ্য, এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও এ আসনে সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পর সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের আরেক নেতা জাফর উল্যাহ চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে বিএনপির টিকিটে সংসদ

সদস্য হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নাজিমউদ্দিন আলম। ২০০১ সালেও বিজয় ধরে রাখেন তিনি। তবে ২০০৮ সালে আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের কাছে হেরে যান বিএনপি নেতা নাজিমউদ্দিন আলম। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদেও নির্বাচিত হন আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। তিনি বর্তমানে উপমন্ত্রী হিসেবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

আওয়ামী লীগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। তিনি চরফ্যাশন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও। তাঁর বাবা এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম। বাবার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জ্যাকব।

সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেন জ্যাকব। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগও আগের চেয়ে অনেক সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। পরে তিনি বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এসব কারণে একরকম অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন জ্যাকব। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগে অন্য কোনো প্রার্থীর নাম এখন পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, জ্যাকব সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় যে পরিমাণ উন্নয়নকাজ হয়েছে বিগত ৫০ বছরেও তা হয়নি। তাঁর উল্লেখযোগ্য উন্নয়নকাজগুলো হচ্ছে—আদালত ভবন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় ভোলা সদর থেকে চরফ্যাশন উপজেলায় স্থানান্তর। চরফ্যাশনে নতুন করে তিনটি থানা স্থাপন, জ্যাকব টাওয়ার নির্মাণ ও চর কুকরী-মুকরীতে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা ইত্যাদি। তিনি নিয়মিত এলাকায় যান। নতুন বছরের শুরুতেও তিনি নির্বাচনী এলাকা চরফ্যাশনে অবস্থান করছেন। যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। গতকাল বৃহস্পতিবারও তিনি চরফ্যাশনে একাধিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জ্যাকবই হলেন এ আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী।

চরফ্যাশন পৌর শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনির উদ্দিন শুভ্র কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে এখন পর্যন্ত জ্যাকবই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী। এখানে অন্য কোনো প্রার্থীর নাম শোনা যায়নি।’

বিএনপি : এখন সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি একসময় ভোলা-৪ আসনে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর দলের সাবেক সংসদ সদস্য নাজিমউদ্দিন আলম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আসছেন না। এতে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপি। অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে দলীয় নেতাকর্মীরা। এর পাশাপাশি কমিটি গঠন নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রয়েছে চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলা বিএনপিতে। সেই সুযোগে মনোনয়নের প্রত্যাশায় কেন্দ্রে জোর লবিং করছেন আরেক সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি। পরে যুবদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁর বাড়ি চরফ্যাশন উপজেলায়। তিনি দলের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। দলের একটি পক্ষ নতুন এ নেতার পক্ষে কাজ করছে বলেও জানা গেছে।

এ ছাড়া বিএনপি থেকে লায়ন এম নজরুল ইসলাম চৌধুরী, মেজর (অব.) ফারুক আহমেদ, সিদ্দিক উল্যাহ মিয়া ও চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী মঞ্জুর হোসেন মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সাবেক সংসদ সদস্য নাজিমউদ্দিন আলমই দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন বলে জানায় স্থানীয় বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

এ ব্যাপারে নাজিমউদ্দিন আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন মালতিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি নাজিমউদ্দিন আলম আগামী নির্বাচনেও দলের একক প্রার্থী। এখান থেকে দলের অন্য কোনো প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে না।’

নাজিমউদ্দিন আলম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় না আসার বিষয়ে বিএনপির আলমগীর বলেন, ‘সারা দেশেই বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা চলছে। নাজিমউদ্দিন আলমও নিজ নির্বাচনী এলাকায় এলে হামলা-মামলার শিকার হন। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনও আমাদের কোনো সহযোগিতা করে না। গত রমজান মাসে তিনি এলাকায় আসার পর তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তাই তিনি এলাকায় আসছেন না।’ এ আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে বলেও দাবি করেন দলের স্থানীয় এই নেতা।

নুরুল ইসলাম নয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আগামী নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এলাকায় একই ব্যক্তি কয়েক বছর ধরে রাজনীতি করবেন, এটা ঠিক নয়। দলের নতুনদের জায়গা দেওয়া দরকার। সে ক্ষেত্রে আমি দলের একজন ত্যাগী ছাত্রনেতা। সব দলেই ক্লিন ইমেজের এবং তরুণ নেতার প্রয়োজন। তাহলেই দেশ এগোবে।’

এ আসনে বিএনপি থেকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক উল্যাহও মনোনয়ন চাইবেন বলে তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান।

জাতীয় পার্টি : ভোলা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কেফায়েত উল্যাহ নজিবের বাড়ি চরফ্যাশনে হলেও সেখানে দলটির তেমন কোনো শক্ত অবস্থান নেই। দলের কমিটির অবস্থাও নাজুক। এ উপজেলায় দলের কমিটি নেই দীর্ঘদিন ধরে।

মনোনয়নের বিষয়ে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কেফায়েত উল্যাহ নজিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে দল থেকে আমি নিজেই মনোনয়ন চাইব।’

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা গেছে, কেফায়েত উল্যাহ ছাড়াও আব্দুল মান্নান, মফিজুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন।



মন্তব্য