kalerkantho


‘১০ হাজারের বিনিময়ে ছাড়া পেলাম’

লিমন বাসার, বগুড়া   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘১০ হাজারের বিনিময়ে ছাড়া পেলাম’

গত বুধবার সন্ধ্যা ৬টা। কর্তব্যরত কর্মকর্তা (ডিউটি অফিসার) সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) কাওসার হোসেন তাঁর আসনে নেই। পাশের কক্ষে একজন কনস্টেবলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কিছু একটা করতে ব্যস্ত তিনি। ফাঁকা থানা। ৬টা ৩৮ মিনিটে থানায় তড়িঘড়ি করে ঢোকেন দ্বিতীয় কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আহসানুজ্জামান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেক এসআই আসলাম হোসেন। গাবতলীতে এই দুই এসআই ‘সামারি অফিসার’ নামে পরিচিত। আসামি ধরা আর ছাড়ানোর জন্য তাঁদের সঙ্গেই যোগাযোগ করে দালালরা।

বলা হচ্ছে বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার কথা। সরেজমিনে গিয়ে বুধবার দেখা গেল, থানার পেছনে নতুন তৈরি একটি সুসজ্জিত ব্যাডমিন্টন মাঠে খেলছেন সিনিয়র সার্কেল এএসপি (গাবতলী-সারিয়াকান্দি) ফজলে খোদা, থানার ওসি খাইরুল বাশারসহ অন্যরা। আর থানার ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়েছে গাঁজা বিক্রির অভিযোগে আটক করা শহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে। তাঁর বাড়ি গাবতলীর লাঠিগঞ্জে। বাবার নাম হবিবর রহমান।

শহিদুল ইসলাম জানালেন, মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে ধরে এনেছেন এসআই আসলাম। এখন ২০ হাজার টাকা দাবি করছেন। দফারফা চলছে। হয়তো ছেড়ে দেবেন। তাঁর কথা সত্য প্রমাণ করে রাত ৮টার কিছু আগে শহিদুলকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাইরে এসে তিনি বললেন, ‘১০ হাজারের বিনিময়ে ছাড়া পেলাম।’

গাবতলী থানার সামনে ছোটখাটো একটি বাজার। নানা রকমের দোকান সেখানে। থানায় কী হয় না হয় সে সবই দেখে এখানকার ব্যবসায়ীরা।

একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, এ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুজ্জামান টাকার কুমির। কম যান না দ্বিতীয় কর্মকর্তাসহ আরো কয়েকজন দারোগা। তাঁরা রাতে টহলের নামে আসামি ধরা-ছাড়ার ‘ব্যবসা’ করেন। কোনো রাতই বাদ যায় না তাঁদের ব্যবসা। আটক ব্যক্তিকে ছাড়াতে বাইরে দফারফা করলে ১০ হাজার টাকা আর থানায় ঢুকলে ২০ হাজার টাকা ‘ধার্য হার’। আর হাজতে ঢুকলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে ৩৪ ধারায় আদালতে চালান দেবেন। কারণ থানার হাজতখানাটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার নজরদারিতে থাকে। এ জন্য পুলিশের এসব সদস্য কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। বেশির ভাগ আসামিকে তাই থানায় আনার পর কর্মকর্তাদের কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। হাজতে দেওয়া হয় দফারফায় না মিললে।

থানার আশপাশের স্থানীয় লোকজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী মডেল থানার পেছনের অংশটি একসময় জঙ্গলে ভরা ছিল। কিছুদিন আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে সুসজ্জিত ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠ তৈরি করা হয়েছে। এসব করেছেন এই সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলে খোদা। সাত লাখের বেশি টাকা খরচ করে করা মাঠটি উদ্বোধন করেন বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান। এ মাঠ তৈরি করতে আশপাশের অনেক ব্যবসায়ীকেই চাঁদা দিতে হয়েছে। এর পরও মাঠের জন্য খরচ করা টাকা তুলতে মরিয়া হয়ে রয়েছেন তাঁরা। জুয়ার আসরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে সে কারণেই।

বুধবার রাত ১১টায় গাবতলী থানা থেকে বের হওয়া একটি পুলিশের পিকআপ ভ্যান দেখিয়ে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘ওই দেখেন, মামারা যাচ্ছে। এখন সারা রাত সামারি করে (লোকজন ধরা আর ছাড়া) ভোরে ফিরবে।’ তাকিয়ে দেখা গেল সব মিলিয়ে পুলিশের ৮-১০ জনের একটি দল। নেতৃত্বে কে রয়েছেন তা বোঝা গেল না।

সম্প্রতি ‘বিডি পুলিশ হেল্প লাইনে’ বগুড়ার গাবতলী উপজেলার একজন সচেতন নাগরিক অভিযোগ করে লিখেছেন, ‘এসপি (পুলিশ সুপার) স্যার সালাম নিবেন। গাবতলী কলেজ ষ্টেশনে প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ২/৩টা পর্যন্ত জুয়ার আসর বসে। এলাকার চিহ্নিত কিছু জুয়ারু এই খেলার উদ্যোক্তা। ওসি স্যার, সার্কেল স্যারের সহযোগিতায় এই খেলা হয়। আপনার নাম করেও এই জুয়ার আসর থেকে টাকা উঠে। বর্তমানে এই থানা পুলিশের সহযোগিতায় পুরো গাবতলী উপজেলা জুয়ার হাটে পরিণত হয়েছে। সারারাত মদ খায় আর জুয়ার আসর চালায় ওসি নিজে। তাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে জুয়ারুদের ধরার জন্য আমাদেরকেই বলে। যারা এই আসর চালায় তারা চিহ্নিত সন্ত্রাসী। আর আমরা সাধারণ মানুষ, পুলিশ আমাদেরকেই ঐ জুয়ারুদের ধরতে বলে। এসপি স্যার, প্লিজ ব্যবস্থা নিবেন। থানার ওসি ও এএসপির নলেজ ছাড়া প্রতিরাতে এই অনৈতিক কাজ কি করে হয়?’

সচেতন এই নাগরিকের অভিযোগের ভিত্তিতে গাবতলী থানার পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। শুধু উত্তরের পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘জুয়ার আসর বন্ধ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।’ তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে এই মামলা, সেই মামলা নয়। জুয়ার বোর্ডের আট হোতাকে ধরা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাতেই দুই লাখ টাকা নিয়ে তাদের ৩৪ ধারায় আদালতে চালান করা হয়। এক দিন পরেই তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আসে।

গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জুয়ার আসরের অন্যতম হোতা কালু ও কুড়ানু নামের দুই ব্যক্তিকে দেখা গেল গাবতলী থানা সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে। জুয়াড়ি সেজে আলাপকালে জানা গেল, তাদের আসরে খেলতে কোনো ভয় নেই। পুলিশ পাহারা দেয়। প্রতি রাতে আট লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার জুয়া চলে সেখানে। তবে এবার স্পট গাবতলী কলেজ স্টেশন নয়, স্পটটি হলো গাবতলীর সোনারায় ইউনিয়নের জামিরবাড়িয়া নামের একটি স্থানের খোলা মাঠ। সেখানে শামিয়ানা টানিয়ে গান বাজিয়ে সারা রাত আসর চলে। জুয়াড়িদের জন্য মাদক ও বিরিয়ানি খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

পুলিশ ধরলে কী করব জানতে চাইলে তাদের একজন বলে, ‘প্রতি রাতে ওসির ক্যাশিয়ার গজারিয়ার আমিনুল নামের একজনের মাধ্যমে ৪২ হাজার টাকা দিই। সে এই টাকা সার্কেল এএসপি, থানার তিন ওসিসহ অফিসারদের ভাগ করে দেয়।’

এসব কথা বলার মধ্যেই কালু ও কুড়ানু সন্দেহ করে বসে এ প্রতিবেদককে। তারা আর কোনো কথা বলতে রাজি না হয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।

জেলার একমাত্র মডেল থানা গাবতলী। আর এই মডেল থানার পুলিশের কাছে এখন সারা রাত চলা জুয়ার আসর হলো সোনার ডিম। প্রতি রাতে থানার সদস্যরা প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা পেয়ে থাকেন এই আসর থেকে। সে জন্য উপজেলার কোথায় কী হলো, সেটি নিয়ে মাথাব্যথা নেই পুলিশ সদস্যদের। সবাই ব্যস্ত জুয়ার আসরে আসা জুয়াড়িদের নিরাপত্তা দিতে। জুয়াড়ির সংখ্যা যত বাড়বে এলাকার আসরের সুনাম তত বাড়বে। আর এটি হলেই পুলিশের সেই সোনার ডিমও হাতে আসবে প্রতি রাতে।

এ ছাড়া জানা গেছে, গাবতলীতে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলে যারা, তাদের কাছ থেকেও প্রতি রাতে টাকা আসে থানায়। এর মধ্যে বালিয়াদীঘি দড়িপাড়ায় ইছামতী নদী থেকে বালু তুলে আব্দুল লতিফ মেম্বার, আলেফ উদ্দিন ও রাশেদুল ইসলাম মেশিনপ্রতি (খননযন্ত্র) পাঁচ হাজার টাকা করে দিয়ে যান। সুখানপুকুরে বিলগাড়ি থেকে উজ্জল নামের এক ব্যক্তি বালু তুলে প্রতি মেশিনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেন। নারুয়ামালায় ইছামতী নদী থেকে বালু তোলেন এবং অন্যের জায়গা ভরাট করে দেন শফিকুল ইসলাম। তিনি থানায় এসে দিয়ে যান ১০ হাজার টাকা। তরণীর হাটে বাঙ্গালী নদী থেকে বালু তোলেন হাবিবুর রহমান রিপন। তিনিও ১০ হাজার টাকা দেন থানায়।

জানতে চাইলে গাবতলী-সারিয়াকান্দি সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলে খোদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জুয়ার আসর গাবতলীতে নয়, হচ্ছে সারিয়াকান্দির চরের মধ্যে। তবে সেটি বন্ধ করা হবে। আর আসামি ধরা-ছাড়ার ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গাবতলী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুজ্জামান ও দ্বিতীয় কর্মকর্তা এসআই আহসানুজ্জামান আসামি ‘ধরা-ছাড়া ব্যবসা’, ‘ঘুষ বাণিজ্য’ ও জুয়ার আসর থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

থানার ওসি খাইরুল বাশার বলেন, তিনি আসার পর থেকে থানার সব ধরনের অনিয়ম বন্ধ করে একটি মডেল থানা হিসেবেই এটিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। আশা করছেন তা তিনি করতে পারবেন।

 



মন্তব্য