kalerkantho


আওয়ামী লীগে দুই নেতার লড়াই, ‘দুর্বল’ বিএনপিতে হাফিজ

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগে দুই নেতার লড়াই, ‘দুর্বল’ বিএনপিতে হাফিজ

লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলা নিয়ে গঠিত ভোলা-৩ আসনটিতে একসময় বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। যে কারণে বেশ কয়েকবার এখানে দলটির প্রার্থী জয়লাভ করেন। অবশ্য গত দুই মেয়াদে আসনটি দখলে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সে কারণে দলটির সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছে। অন্যদিকে বিএনপি আগের চেয়ে দুর্বল হয়েছে।

আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দুই দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। কারণ সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন আহমেদ দলের মনোনয়ন চাইবেন।

অন্যদিকে বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বীরবিক্রম বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আগামীবার মনোনয়ন প্রশ্নে বিরোধিতার মুখে পড়েছেন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতার। তবে দলটির অনেকেই মনে করছেন, হাফিজ উদ্দিনই দলের মনোনয়ন পাবেন।

জাতীয় সংসদের ১১৭ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটিতে ভোটারের সংখ্যা দুই লাখ ৫৪ হাজার ৭০০। এর মধ্যে আছে লালমোহনে এক লাখ ৮০ হাজার ৫১৬ জন ও তজুমদ্দিনে ৭৪ হাজার ১৮৪ জন।

১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মোতাহার মাস্টার। পরের বছর তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এর পরের সংসদে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়ে যায়। কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো বিএনপির দখলে চলে যায়। এর মধ্যে প্রায় ২৩ বছর ধরে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির সহসভাপতি হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ। তিনি প্রথমে জাতীয় পার্টি থেকে, এরপর স্বতন্ত্র এবং সর্বশেষ ১৯৯১

সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ওই দল থেকে সংসদ সদস্য হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আসনটি দখলে নেয়। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে উচ্চ আদালত তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল করেন। এরপর ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। তিনি বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য হন শাওন।

আওয়ামী লীগ : এ আসনে এখন আওয়ামী লীগ অনেকটাই শক্তিশালী। তবে, সম্প্রতি ‘মৌমাছি বাহিনী’সহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ায় দলের তৃণমূল অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এ ব্যাপারে লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও চরভূতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ উপজেলায় এখন কোনো আওয়ামী লীগ নেই। এখানে চলছে আত্মীয় লীগ। এ দল-ও দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন আওয়ামী লীগের পরিবর্তে শাওন লীগ দিয়ে চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমান এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন বিএনপি নেতাকর্মী ও তাঁর আত্মীয় দিয়ে দল চালাচ্ছেন।’

একই বিষয়ে লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার হাতেই লালমোহনে আওয়ামী লীগ তৈরি। এখানে দলের অবস্থান ভালো। তবে, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপি হওয়ার পর পুরনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। অন্যদিকে তিনি বিএনপি নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদ-পদবি দিয়ে রেখেছেন। এসব খবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত জানেন।’ তিনি আরো বলেন, নুরুন্নবী চৌধুরী ছাড়া অন্য যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে সেই এ এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।

তবে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন দাবি করে বলেছেন, ‘এমপি হওয়ার পর এখানে আমি যে উন্নয়ন করেছি, বিগত বছরে সেই উন্নয়ন হয়নি। আমি এ আসনের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে দলকে শক্তিশালী করেছি। তাই আগামী নির্বাচনেও দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে আমার বিশ্বাস।’ 

মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ থেকে আবার মনোনয়ন চাইবেন—এমন আলোচনা রয়েছে। তিনি এলাকায় গণসংযোগও করছেন। দলের অনেক নেতাকর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

জসিমউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০৮ সালে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমকে হারিয়ে আমি এমপি হয়েছিলাম। আগামী নির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মীর মোবাশ্বের আলী স্বপনও এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান। তিনি কালের কণ্ঠকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

বিএনপি : সংসদের বাইরে থাকা দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিনের কাছ থেকে বহু ত্যাগী নেতাকর্মী দূরে সরে গেছেন। এর জন্য তাঁরা হাফিজ উদ্দিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের পকেট কমিটি তৈরি করাকে দায়ী করেছেন। একসময় স্থানীয় বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে তাঁর বিরোধিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন দুইজন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান, সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাবেক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক। বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে তাঁরা হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে চরম বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরা আগামী সংসদ নির্বাচনে হাফিজকে বাদ দিয়ে ২০ দলীয় জোট থেকে নতুন একজন শক্ত প্রার্থী দেওয়ারও চিন্তাভাবনা করছেন। এতে ক্রমেই ভাবমূর্তি হারাচ্ছেন তিনি।

এ ছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছে, দলীয় বিরোধ থাকার কারণে ইতিমধ্যে দলের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। ফলে আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপি। দুই উপজেলায় দলটি কার্যত দুই টুকরো হয়ে গেছে। এর মধ্যে হাফিজবিরোধীরা এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তার পরও শেষ পর্যন্ত হাফিজই দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছে দলের নেতাকর্মীরা।

তবে হাফিজবিরোধী হিসেবে পরিচিত লালমোহন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আক্তারুজ্জামান টিটব মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী।’

আক্তারুজ্জামান আরো বলেন, ‘এখন আর হাফিজ উদ্দিনের কোনো অবস্থান নেই। তিনি প্রায় সাত বছর নিজ এলাকায় আসতে পারেননি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিএনপিকে সংগঠিত করেছি।’

এ ছাড়া এম আর হাওলাদার ও মোস্তাফিজুর রহমান নামের আরো দুই নেতা বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

জাতীয় পার্টি : দলটি থেকে অনেকেই মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তাঁরা হলেন কামাল উদ্দিন, এ কে এম নজরুল ইসলাম, নুরনবী সুমন ও ফজলুল হক।

 



মন্তব্য