kalerkantho


তৃণমূল চায় আজম-হাফিজকে আছে নতুনদেরও উঁকিঝুঁকি

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তৃণমূল চায় আজম-হাফিজকে আছে নতুনদেরও উঁকিঝুঁকি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোলা-২ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিসহ (বিজেপি) বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁরা দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তদবির শুরু করেছেন। পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। ভোটারদের সঙ্গেও মত বিনিময় করছেন।

গণসংযোগ ও সাংগঠনিক যোগাযোগের দিক থেকে এগিয়ে আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের আলী আজম মুকুল, যিনি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা। বিএনপিতে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম। দুটি দলেরই তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দ এ দুজন। তবে বড় দুটি দলেই মনোনয়নের জন্য নতুনদের তৎপরতা আছে, যদিও তাঁদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। তবে এমন ধারণা আছে যে ওই সব নেতা মনোনয়ন পেলে মাঠে প্রচারে নামবেন। আর মনোনয়ন না পেলে এলাকায় আসবেন না।

জাতীয় সংসদের ১১৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা ভোলা-২ আসনটি বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটারসংখ্যা দুই লাখ ৮৯ হাজার ৬৬৩।

স্বাধীনতার আগে দৌলতখান, তজুমদ্দিন ও মনপুরা উপজেলা নিয়ে ছিল ভোলা-২ আসন। স্বাধীনতার পর এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ভাষাসৈনিক রেজা-এ-করিম চৌধুরী (চুন্নু মিয়া)। পরে বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান নিয়ে আসনটি পুনর্বিন্যস্ত হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ। তবে ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য হন জাতীয় পার্টি নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে হাইকমান্ড সিদ্দিক। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ২০০১ সালে আসনটি দখলে নেয় বিএনপি। সংসদ সদস্য হন হাফিজ ইব্রাহিম। ২০০৮ সালে আবার নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন তাঁর ভাতিজা আলী আজম মুকুল

আওয়ামী লীগ : এ আসনের বর্তমান আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল নভেম্বর মাসের শেষ দিকে টানা প্রায় এক সপ্তাহ নিজ নির্বাচনী এলাকায় এসে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। বছরের শুরুতেও তিনি এলাকায় আছেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করছেন। উঠান বৈঠকও করেছেন প্রায় অর্ধশত গ্রামে। এ সময় তিনি ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে জানান দলের তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

এ ব্যাপারে বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুতুবা ইউনিয়ন পরিষদের টানা তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জোবায়েদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান এমপি আলী আজম মুকুলই আগামী নির্বাচনে বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান আসনের দলীয় মনোনয়ন পাবেন। এর বাইরে কোনো নেতাকে তৃণমূল আওয়ামী লীগ মেনে নেবে না।’

জানতে চাইলে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেন আলী আজম মুকুল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাখি কখনো ডাল ভাঙার ভয় করে না। সে ভরসা রাখে ডানার ওপর। আমিও ডাল ভাঙার ভয় করি না। আমার ওপরের ভরসা আল্লাহ। আর জমিনের ভরসা সাধারণ মানুষ। আমি তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করি। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আমাকে নির্বাচিত করবেন।’

এ ছাড়া ড. আশিকুর রহমান শান্ত আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন। তিনি এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তোফায়েল আহমেদের কাছে হেরে যান। তিনি এলাকায় তেমন আসছেন না এবং আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করছেন দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

অবশ্য ড. আশিকুর রহমান শান্ত নভেম্বর মাসের শেষ দিকে একবার দৌলতখান উপজেলায় গণসংযোগ করেছেন বলে তাঁর অনুসারীরা জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আশিকুর রহমান শান্ত আওয়ামী লীগের কেউ নন। তাই দল থেকে তাঁর মনোনয়নের প্রশ্নই আসে না।’

তবে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে ড. আশিকুর রহমান শান্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাকে নৌকা প্রতীক দেন তাহলে ভোলা আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা আমার নির্বাচন করবেন।’

এ ছাড়া আবুল কালাম আজাদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও তিনি এলাকায় আসছেন না বলে জানান দলের নেতাকর্মীরা। এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকলেও যুবলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান হিরণও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান তিনি।

বিএনপি : আওয়ামী লীগদলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীর চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন বিএনপিদলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা। তাঁরা কেউ এলাকায় তেমন আসছেন না। কেউ কেউ ঢাকা ও চট্টগ্রামে বসবাস করছেন। কেউ বা দেশের বাইরেও আছেন।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, পদ-পদবি নিয়ে দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমই এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী। এর বাইরে অন্য কাউকে দলের তৃণমূল নেতাকর্মী মেনে নেবে না। আইনি জটিলতার কারণে ২০ দলীয় জোট থেকে সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

এ ব্যাপারে দৌলতখান উপজেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মীর গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনী মাঠে হাফিজ ইব্রাহিমই দলের একক প্রার্থী। অন্য কাউকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। হাফিজ ইব্রাহিম দুঃসময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন।’

বোরহানউদ্দিন উপজেলার সরকারি (প্রস্তাবিত) আব্দুল জব্বার কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি দানিশ চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে বিএনপি নেতা হাফিজ ইব্রাহিম দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন। তাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি ছাড়া অন্য কোনো নেতার দৃশ্যমান অবস্থান নেই। তাই আগামী নির্বাচনে হাফিজ ইব্রাহিমই বিএনপির একক প্রার্থী।’

বোরহানউদ্দিন পৌর বিএনপির সভাপতি সাইদুর রহমান মিলন বলেন, ‘হাফিজ ইব্রাহিম বিএনপির একক প্রার্থী। এখানে অন্য কোনো প্রার্থীর কোনো প্রচারণা নেই। তাঁদের প্রচারণা শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আর দেয়ালের পোস্টারেই সীমাবদ্ধ। তাঁদের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের কোনো যোগাযোগ নেই।’

হাফিজ ইব্রাহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। তাই দলীয় নেতাকর্মীরা আমার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। এখানে অন্য কোনো প্রার্থীর দৃশ্যত কোনো অস্তিত্ব নেই।’

এ ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী, ফুটবলার আমিনুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর এম আলম ও রফিকুল ইসলাম মমিনের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে তাঁরা এলাকায় খুব একটা আসছেন না।

জাতীয় পার্টি : আগামী নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক সংসদ সদস্য সিদ্দিকুর রহমান, কেফায়েত উল্যাহ নজীব ও মিজানুর রহমান সম্ভাব্য প্রার্থী বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁরাও কেউ এলাকায় কোনো গণসংযোগ করছেন না। তাঁরা সবাই ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানায় এলাকাবাসী। 

জামায়াত : বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রম থমকে আছে। দলীয় নেতাকর্মীরাও আপাতত নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। তার পরও আবুল বসারের নেতৃত্বে বোরহানউদ্দিন উপজেলায় জামায়াত কিছুটা সংগঠিত। তারা ওই উপজেলার দলীয় কার্যালয়ে এবং পৌরসভার পাশের একটি দাখিল মাদরাসায় নিয়মিত সভা করছে বলে জানা গেছে। তবে এ আসনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই।



মন্তব্য