kalerkantho


রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা ত্রাণ পাবে

আবুল কাশেম   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা ত্রাণ পাবে

নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্যের কোনো অভাব নেই। তাদের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া খাদ্যসামগ্রী মজুদ আছে তিন হাজার টনেরও বেশি। কিন্তু অভাব-অনটনে দুরবস্থায় টেকনাফ-উখিয়ার প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি। রোহিঙ্গাদের কারণে তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। তাদের ঘরে খাবার নেই, হাতে কাজও নেই। ফলে নেই খাবার কেনার মতো পয়সাও। এ অবস্থায় ওই এলাকার অভাবগ্রস্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে যাচ্ছে সরকার। চলতি মাস থেকেই প্রতি পরিবারকে ত্রাণ হিসেবে ২০ কেজি করে চাল ও গম দেওয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

রোহিঙ্গা দমন শুরু হওয়ার সময় থেকেই নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে দিনমজুরদেরও এখন কোনো কাজ নেই। কারণ রোহিঙ্গারা আরো কম টাকায় ওই সব কাজ করে দিচ্ছে। দেশি-বিদেশি যেসব এনজিও আগে টেকনাফ-উখিয়ার দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করত, তারা এখন বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করছে। এসব কারণে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে অভাবের পাশাপাশি অসন্তোষও দানা বাঁধছে। স্থানীয় বাংলাদেশিদের ওই অভাব ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরে তাদের আর্থ-সামাজিক সহায়তা দিতে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। ওই প্রস্তাবের পরিপ্র্রেক্ষিতেই স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ্ কামাল গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে টেকনাফ ও উখিয়ার বাংলাদেশিদের আয় কমে গেছে। তাদের সহায়তার জন্য চলতি মাস থেকেই প্রতি পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল ও গম ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া জাইকা এবং ইউনিসেফের কাছেও সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জানা যায়, রোহিঙ্গাদের কারণে টেকনাফ ও উখিয়ার বাসিন্দাদের আয় কমে যাওয়া ও দুর্ভোগ বাড়ার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদসচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, পররাষ্ট্রসচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠান কক্সবাজারের ডিসি মো. আলী হোসেন। তাতে তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের দুর্ভোগ যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা না হলে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে অসন্তোষ আরো বাড়তে পারে।

কক্সবাজারের ডিসির চিঠির তথ্যানুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ। আর বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫০। রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দিন দিন অসন্তোষ তীব্রতর হচ্ছে।

স্থানীয় বাংলাদেশিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করে চিঠিতে ডিসি লিখেছেন, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বর্তমানে স্থানীয় অধিবাসীর প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে নিত্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা বাংলাদেশি প্রান্তিক চাষি ও স্বল্প আয়ের লোকজনের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তিনি আরো লিখেছেন, ‘উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় স্থানীয় শ্রমবাজারে অসন্তোষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদা অনেকটা মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের দ্বারাই পূরণ হচ্ছে। এমনকি মজুরির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাংলাদেশি শ্রমিকরা যথাযথ শ্রমমূল্য পাচ্ছে না।’

টেকনাফের অনেক জেলে নাফ নদে মাছ ধরে তা বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। সে রাস্তাও এখন বন্ধ। ডিসি বলেছেন, ‘টেকনাফ উপজেলার নাফ নদ পার হয়ে মিয়ানমারের নাগরিকরা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে বিধায় নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় প্রান্তিক জেলে সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা ব্যাহত হওয়াসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এর আগে যেসব দেশি এনজিও উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বাংলাদেশি লোকদের কল্যাণে কাজ করত, সেসব এনজিও এখন বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে শুধু রোহিঙ্গাদের কল্যাণে কাজ করছে। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

চিঠিতে আলী হোসেন বলেছেন, ১০ লাখ রোহিঙ্গার কারণে শস্য, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত জুলাই মাসের প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের পর সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের কারণে রাস্তাঘাটের আরো ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনে ও প্রাঙ্গণে মিয়ানমারের নাগরিক এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থানের কারণে অবকাঠামোগত ক্ষতিসাধন ছাড়াও শিক্ষার পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।


মন্তব্য