kalerkantho


যন্ত্রসংগীত উৎসব

বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা ঐকতান

নওশাদ জামিল   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা ঐকতান

শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে ১০ দিনব্যাপী জাতীয় যন্ত্রসংগীত উৎসবের একটি মুহূর্ত। ছবি : কালের কণ্ঠ

শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চ ভেসে আছে জলের ওপর। তার মধ্যে ফোয়ারা। সেখানে অবিরল ধারায় ঝরছিল জল। আর মঞ্চটিও তখন ভাসছিল সুরের ঝরনাধারায়। সেখান থেকে ভেসে আসছিল তবলা, সেতার, সরোদ, বাঁশিসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের ঐক্যতান। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে জলের ওপর ভাসমান নন্দনমঞ্চ রূপ নেয় স্বর্গীয় আবহে। নতুন বছরের প্রথম দিন গতকাল সোমবার জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে জাতীয় যন্ত্রসংগীত উৎসব। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের ৬৩ জেলা থেকে এক হাজার ২০০ জন যন্ত্রশিল্পী অংশ নিচ্ছেন এ উৎসবে।

বাদ্যপ্রিয় বাঙালির যাপিত জীবনে প্রায় ৬০০ ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। অথচ ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। পেশা বদল করছেন যন্ত্রীরাও। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া কল্পনা করা যায় না সংগীত। শিল্পীদের কদর বাড়লেও যন্ত্রীরা অবহেলিত। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সব জেলার বরেণ্য বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত হয়েছে জাতীয় যন্ত্রসংগীত উৎসব।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় আতশবাজির বর্ণিল ঝলকানিতে শুরু হয় এ উৎসব। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা যন্ত্রীদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। আতশবাজির পাশাপাশি সন্ধ্যায় আকাশে ওড়ানো হয় ঝাঁকে ঝাঁকে ফানুশ। সঙ্গে রংবেরঙের অসংখ্য বেলুন। ওই সময় কয়েক শ যন্ত্রশিল্পী একসঙ্গে বাজান লালন সাঁইয়ের ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ গানের সুর।

তার আগে বিকেলে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বরেণ্য গিটারবাদক এনামুল কবির। স্বাগত বক্তব্য দেন সরকারি সংগীত কলেজের শিক্ষক ও উৎসবের সমন্বয়ক কমল খালিদ।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘যন্ত্রসংগীত নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। একদিকে যেমন বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যাচ্ছে; তেমনি ক্রমাগত কমছে যন্ত্রশিল্পীদের সংখ্যা। এটি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়।’

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় যন্ত্রসংগীত পরিবেশনা। শুরুতে মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিবেশিত হয় অর্কেস্ট্রা ‘উড়ন্ত পাখি’। গতি, ছন্দ, লয় ও ধ্বনির মিশ্রণে এতে কলরব করে পাখি। মনিরুজ্জামান পরিবেশন করেন বৈদ্যুতিক বাঁশি, সিলভার বাঁশি, সেক্সোফোন, সুপ্রানো সেক্সোফোন। তার সঙ্গে সেতারে ছিলেন ফিরোজ খান, সরোদে ইউসুফ খান, গিটারে রিচার্ড কিশোর, পারকাশনে একরাম হোসেন, কি-বোর্ডে রবিনস্ৎ চৌধুরী, অক্টোপ্যাডে শেখ পুলক, পাখওয়াজে সুষেণ কুমার রায়, তবলায় ইফতেফার আলম ডলার, বেহালায় মো. নুরুজ্জামান এবং কণ্ঠে স্বরলিপি। অর্কেস্ট্রা পরিবেশনা শেষে এনামুল কবির পরিবেশন করেন হাওয়াইন গিটার।

দ্বিতীয় পর্বে ছিল বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শিল্পীদের পরিবেশনা। পর্বটি শুরু হয় চট্টগ্রাম জেলার শিল্পীদের পরিবেশনা দিয়ে। এতে মোহনবীণায় দোলন কানুনগো, বেহালায় শ্যামল চন্দ্র দাশ এবং তবলায় বোল তোলেন শাখাওয়াত হোসেন।

রংপুর জেলার শিল্পীরা দলীয়ভাবে পরিবেশন করেন রাগ ইমন। শিল্পীদের মধ্যে সন্তুরে ছিলেন তমাল কান্তি লাহিড়ী, সেতারে আহসান হাবীব, এখলাস মিয়া দুলু, বেহালায় শহিদুজ্জামান, এস্রাজে নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ, তবলায় বিপ্লব চন্দ্র রায় এবং গিটারে ছিলেন প্রত্যয়। একক পরিবেশনার শুরুতে আহসান হাবীব সেতারে পরিবেশন করেন রাগ চারুকেশী। এরপর সন্তুরের যুগলবন্দিতে তমাল কান্তি লাহিড়ী, শহিদুজ্জামান ও পলক পরিবেশন করেন রাগ হংসধ্বনি।

তারপর ছিল নারায়ণগঞ্জ জেলার শিল্পীদের পরিবেশনা। যাতে তবলায় রাগ চন্দ্রকোষ ও ধুন পরিবেশন করেন সবুজ আহমেদ। একই রাগ ও ধুনে বেহালায় পৃথক পরিবেশনায় অংশ নেন শিল্পী শান্ত আহমেদ ও কামরুল আহমেদ।

প্রথম দিনের আয়োজনের শেষ পরিবেশনা ছিল বাংলাদেশ মিউজিশিয়ান ফাউন্ডেশনের শিল্পীদের। দলটি পরিবেশন করে অর্কেস্ট্রা ‘বায়ান্ন থেকে একাত্তর’। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে গানগুলো ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত কিছু গান নিয়ে এই অর্কেস্ট্রাটি সাজানো হয়েছে। পরিচালনায় ছিলেন এ কে আজাদ মিন্টু ও বিশ্বজিৎ সরকার।

আজ মঙ্গলবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সেতার পরিবেশন করবেন ফিরোজ খান, আবরার বেহালা এবং বাঁশি পরিবেশন করবেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম। পাশাপাশি থাকছে সুনামগঞ্জ, যশোর, রাজবাড়ী, নাটোর, বরগুনা ও মেহেরপুরের শিল্পীদের পরিবেশনা।



মন্তব্য