kalerkantho


আসামে নাগরিক তালিকায় নাম নেই প্রায় দেড় কোটির

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আসামে নাগরিক তালিকায় নাম নেই প্রায় দেড় কোটির

আসামে কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত ও বিতাড়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন’ (এনআরসি) তালিকার প্রথম খসড়া প্রকাশ করেছে রাজ্য সরকার। রবিবার মধ্যরাতে এই তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। এতে আসামের তিন কোটির বেশি নাগরিকের মধ্যে এক কোটি ৯০ লাখ নাগরিক স্থান পেয়েছে। বাদ পড়েছে এক কোটি ৩৯ লাখ মানুষ। তাদের আবেদন আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে যাচাই-বাছাই করা হবে। আসামে মোট নাগরিকের সংখ্যা তিন কোটি ২৯ লাখ।

দাঙ্গা সৃষ্টির আশঙ্কায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে খসড়া তালিকাটি প্রকাশ করল আসাম রাজ্য সরকার। তালিকা প্রকাশ সামনে রেখে গত সপ্তাহে ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্সের ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয় আসামে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে কড়া নজরদারি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যারা বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়ে স্থায়ী হয়েছে, কেবল তারাই তালিকায় স্থান পাচ্ছে। মূলত বাঙালি মুসলমানরাই এ তালিকার যাচাইপ্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও তারা একে স্বাগতও জানিয়েছে। কারণ সব সময়ই ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ পরিচয় শোনার চেয়ে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে তারা স্বস্তি পেতে চায়।

ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল শৈলেস বলেন, এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ যারা বাদ পড়ছে, তাদের নাম যাচাইপ্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তিনি বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকেই চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের আগ পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে।

১৯৫১ সালের পর এই প্রথম রাজ্যটিতে নাগরিকদের তালিকা করা হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে আন্দোলনের মুখে আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ‘আসাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির প্রেক্ষাপটে ২০০৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আসামে নাগরিক তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেয়। পরে ২০১৫ সালে তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ওই চুক্তিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে আসামে যাওয়া বিদেশি নাগরিকদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল এবং ২৫ মার্চের পরে যাওয়া ব্যক্তিদের বিতাড়িত করার শর্ত ছিল। বিদেশিরা স্থানীয় হিন্দুদের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে—এই অভিযোগ তুলে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বিতাড়নের লক্ষ্যে তখন আন্দোলনে নেমেছিল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, যার ফলে ব্যাপক হতাহতের পর চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকার। এই ইস্যুটিকে রাজনীতিতে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই তালিকা করার নির্দেশ দিলেও বারবার তারিখ পেছাতে থাকে অতীতের রাজ্য সরকারগুলো। শেষ পর্যন্ত বিদায়ী বছরের ৩১ ডিসেম্বর তারিখ বেঁধে দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। গত বছর আসামের রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই তালিকা তৈরির কাজ গতি পায়। তবে চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কোনো সময়সীমা এখনো বেঁধে দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট আরো কয়েক মাসের সময়সীমা বেঁধে দিতে পারেন।

তালিকা প্রকাশ সামনে রেখে রাজ্যজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই কড়াকড়ি করা হয়। মোতায়েন করা হয় ৬০ হাজার সেনা। এ ধরনের তালিকা করা হলে মুসলমানদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে—আসামের মুসলিম নেতাদের এই হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা নিয়ে এত কড়াকড়ি করা হয়। তবে গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত কোনো ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তালিকা প্রকাশের আগে রাজ্যের মুসলমানদের খুবই উদ্বিগ্ন দেখা গেছে, তারা তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে এই ভয়ে। তালিকা প্রকাশের পর তাত্ক্ষণিকভাবে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

আসাম পুলিশের মহাপরিচালক মুখেশ সাহাই বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। অনলাইনে তালিকা প্রকাশের পর থেকে লোকজনকে এনআরসি অফিসে যোগাযোগের সময় দিতে হবে। যদি তালিকায় কারো নাম থাকে, তাহলে সশরীরে সেটি যাচাই করা হবে।’

আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এরই মধ্যে তালিকা নিয়ে জনমনে ভীতি না ছড়াতে লোকজনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, এনআরসি থেকে প্রকৃত কোনো ভারতীয় বাদ পড়বে না। যদি প্রথম খসড়ায় কেউ বাদ পড়ে, তালিকায় তাদের নাম তোলার দাবি জানানোর সুযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে রাজ্য সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এ নিয়ে ভুল তথ্য দিয়ে কেউ যাতে আতঙ্ক ছড়াতে না পারে সে জন্য ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নিবিড়ভাবে নজরদারি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

আসাম রাজ্য সরকার জানিয়েছে, যেসব ব্যক্তি তাদের পরিবারের সদস্যদের ১৯৫১ সালের আগে এই রাজ্যে আসার তথ্য দিতে পারবে অথবা ভারতের নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী তাদের পরিবারের সদস্যরা যদি প্রমাণ করতে পারে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে তারা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা আসামে এসেছিল, তাহলে তারা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে। সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস, দি ইকোনমিক টাইমস (ইন্ডিয়া)।



মন্তব্য