kalerkantho


তোফায়েলেই ভরসা আ. লীগের বিএনপি-বিজেপিতে দ্বন্দ্ব

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তোফায়েলেই ভরসা আ. লীগের বিএনপি-বিজেপিতে দ্বন্দ্ব

স্বাধীনতার পর থেকে ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত তোফায়েল আহমেদ দলকে সুসংগঠিত করে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী করেছেন। তিনি ভোলা সদর আসন থেকে পাঁচবার এবং ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি ভোলা সদর আসনের একক প্রার্থী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী নিয়ে এ মনোভাব ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি ও এর জোটের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে টানাপড়েন রয়েছে। দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছে, আগামী নির্বাচনে তারা দলের প্রার্থী চায়। অন্যদিকে জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এ আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন—এমন সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বলে দলটির নেতাকর্মীরা জানায়।

রাক্ষসী মেঘনা আর প্রমত্তা তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলার সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ভোলা-১ (সদর) আসন। জাতীয় সংসদের ১১৫ নম্বর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৮৫ হাজার ৮৩০ এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৮২ হাজার ৯৯৫।

আসনটি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল। ১৯৭০ সালে প্রথম এমএলএ নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ। এরপর ১৯৭৩ সালে এ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে আসনটি চলে যায় বিএনপির দখলে। তখন পারিবারিক প্রভাবের কারণে সংসদ সদস্য হন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোশারেফ হোসেন শাজাহান। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে আসনটি চলে যায় জাতীয় পার্টির দখলে। তখন সংসদ সদস্য হন দলের প্রভাবশালী নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুর। ১৯৯১ সালে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। তখন সংসদ সদস্য হন তোফায়েল আহমেদ। ২০০১ সালে এ আসনে চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি বিজেপি চেয়ারম্যান পার্থর কাছে হেরে যান। এরপর থেকে তিনি ভোলায় আসা প্রায় বন্ধ করে দেন। ওই নির্বাচনে ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসন থেকে সংসদ সদস্য হন তোফায়েল আহমেদ। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে আবার সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ।

আওয়ামী লীগ : বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোলা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন বলে জানায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট থেকে তোফায়েল আহমেদের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত।

তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে দলের জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু মোল্লা ও কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান হিরণের নাম শোনা যাচ্ছে। কিন্তু দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী জানায়, ওই দুই নেতার সঙ্গে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কোনো যোগাযোাগ নেই। তাঁরা এলাকায় না এসে বেশির ভাগ সময়ই ঢাকায় অবস্থান করেন। সে কারণে দলের ভেতরেও তাঁরা অনেকটাই কোণঠাসা।

অন্যদিকে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার পরেও এলাকায় পর্যাপ্ত সময় দেন। তিনি মাসে অন্তত একবার তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকায় এসে দলীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কিংবা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিদর্শন করেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

দলীয় নেতাকর্মীরা বলছে, তোফায়েল আহমেদ নদীভাঙনের হাত থেকে ভোলাকে রক্ষায় কাজ করেছেন। পৌর এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন। ভোলা-বরিশাল সড়কপথের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন। এ ছাড়া রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণে কাজ করেছেন। সে কারণে দলের এ বর্ষীয়ান নেতা আগামী নির্বাচনেও ভোলা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন।

এ বিষয়ে ভোলা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল ইসলাম বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোলায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। তিনি বলেন, সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে কমিটি গঠনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্য সব শাখার কমিটিও গঠন-পুনর্গঠন করে দলকে শক্তিশালী করার কাজ চলছে। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে মহিলা সমাবেশ করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মইনুল হোসেন বিপ্লব বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা দলকে সুসংগঠিত করছি। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করছি। নির্বাচনের জন্য দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন প্রস্তুত।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মমিন টুলু বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে এ আসনে তোফায়েল আহমেদই তৃণমূল আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী।’

বিএনপি : ভোলা সদর আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে তাদের শরিক দল বিজেপির বিস্তর দূরত্ব রয়েছে। সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সঙ্গে বিজেপির দ্বন্দ্ব এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিএনপি বলছে, কোনো মতেই আগামী নির্বাচনে এ আসনে অন্য কোনো শরিক দলকে ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, এ আসনে এবার দলটির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ জোটের মনোনয়ন পাবেন। ভেতরে ভেতরে বিএনপির একটি পক্ষও বিজেপি নেতার হয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

বিএনপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের দলের মনোনয়ন চাইবেন জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর। বিএনপির সঙ্গে বিজেপির দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করে জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আকবর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইলিশ মাছের সঙ্গে দায়ের যেমন সম্পর্ক, বিএনপির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্কও ঠিক তেমন।’ তিনি আরো বলেন, ‘জোট থেকে বিজেপি নেতা পার্থকে দলীয় মনোনয়ন দিলে বিএনপি মেনে নেবে না।’ আর বিএনপিও সেই ভুল করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, একসময় সাবেক মন্ত্রী মোশারেফ হোসেন শাজাহান জেলা বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই সময়ে ভোলা ছিল বিএনপির দুর্গ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এখন দলটি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে দলের সাংগঠনিক কাঠামো।

এ কথা স্বীকার করে জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রাইসুল আলম বলেন, মোশারেফ হোসেনের মৃত্যুর পর দল অনেক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিএনপি এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই এ আসনে বিজেপি নেতা আন্দালিব রহমান পার্থই হলেন ২০ দলের যোগ্য নেতা।

তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ (ট্রুম্যান) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এর বাইরে আমরা কোনো প্রার্থীকে মেনে নেব না।’

বিজেপি : বিজেপি বলছে, এ আসন থেকে ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। আগামী নির্বাচনেও এ আসনে জোট থেকে তিনি মনোনয়ন পাবেন।

দলের নেতাকর্মীরা জানায়, পার্থর মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত হওয়ায় ভোলায় ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে বিজেপি। তাদের দাবি, সম্প্রতি ঢাকায় ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের এক সভায় ভোলা-১ (সদর) আসনে জোট থেকে বিজেপি চেয়ারম্যানকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এ খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের পর ভোলায় বিজেপি নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। সাংগঠনিকভাবেও দল আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী বলেও দাবি দলীয় নেতাকর্মীদের।

জামায়াত : ভোলা সদর আসনে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড বরাবরই ধীরগতির। অনেকটা নীরবে চলছে তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে বিএনপির সঙ্গে দলটির মাঝেমধ্যে বিরোধ দেখা দিলেও পরবর্তী সময়ে আবার সেই বিরোধ মিটিয়ে ফেলা হয় জোটের স্বার্থেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা জোটের পক্ষেই শক্তভাবে কাজ করে।



মন্তব্য