kalerkantho


উৎসব

রণাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের গান

নওশাদ জামিল   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রণাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের গান

শতকণ্ঠে ‘মুক্তির জয় বলো ভাই’ পরিবেশনা। গতকাল জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নারী শিল্পীদের পরনে লাল পাড়ের সবুজ শাড়ি, ছেলেদের পরনে সবুজ পাঞ্জাবি। দূর থেকে মনে হবে জাতীয় পতাকায় শোভিত মঞ্চ। তাতে উপবিষ্ট শত কণ্ঠশিল্পী। তাঁদের পোশাকেও লাল-সবুজের আভা। সমবেত কণ্ঠে গাইলেন তাঁরা। শতকণ্ঠে একযোগে উচ্চারিত হলো শুধুই রবীন্দ্রনাথের গান। মহান মুক্তিযুদ্ধে কবিগুরুর গান আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে এনেছিল অফুরন্ত সাহস। একাত্তরের রণাঙ্গনে গীত কবিগুরুর সেসব গান নিয়ে বিজয়ের মাসে ভিন্নধর্মী উৎসব আয়োজন ছিল গতকাল রবিবার। তাতে শিল্পীরা শোনালেন কবিগুরুর স্বদেশ পর্যায়ের নানা গান, শোনালেন  আবৃত্তি।

‘শতকণ্ঠে রণাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের গান’ শীর্ষক উৎসবটি রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজিত হয়। যৌথভাবে এই ভিন্নধর্মী উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় জাদুঘর ও রবীন্দ্র একাডেমি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব বাঙালি জীবনে সর্বব্যাপী। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অজস্র সৃষ্টি দিয়ে বাঙালি জীবনে তিনি মিশে আছেন স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। সব ন্যায়সংগত আন্দোলনে, মানবতাবাদী চেতনার উন্মীলনে, শুভ সংকল্পে এমনকি রণাঙ্গনেও রবীন্দ্রনাথের অপরিহার্য উপস্থিতি। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্র তিনি এক শাণিত হাতিয়ার। ষাটের দশকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের শক্তির উল্লেখযোগ্য একটি উৎস। অনুরূপভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান আমাদের প্রাণিত করেছে, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। কবিগুরুর সেসব গান নিয়েই ছিল এই উৎসব।

উৎসবের প্রথম পর্বে শতকণ্ঠে পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত। তারপর ছিল সংক্ষিপ্ত আলোচনা। তাতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

উৎসবের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজন কামাল লোহানী। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সব সময় প্রাসঙ্গিক। তাঁর গান ছিল আমাদের লড়াইয়ের হাতিয়ার। কেননা তিনিই তো আমাদের শিখিয়েছেন—বাঁধা দিলে বাঁধবে লড়াই। পাকিস্তানি শাসনামলে সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আপন করে নিয়েছিলাম। আর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর রচনাকে আমরা হাতিয়ার বানিয়েছিলাম।’

রবীন্দ্র একাডেমির সভাপতি আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান। কেননা আমাদের রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর দর্শন, গান, কবিতা যুদ্ধদিনেও আমাদের শক্তি জুগিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। এবার বিজয়ের মাসের শেষ দিনে তাই আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।’

রবীন্দ্র একাডেমির সাধারণ সম্পাদক বুলবুল মহলানবীশ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান। শুধু গান ও কবিতা নয়, তাঁর নানামাত্রিক রচনা রণাঙ্গনে আমাদের প্রাণিত করেছে।’

সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। শতকণ্ঠে শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।/তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।’ গানটির কথা ও সুর একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করেছে, দেশমাতৃকার ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দিয়েছে অনুপ্রেরণা। এরপর পরিবেশিত হয় কবিগুরুর ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা!’ এবং ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে।/ঘরের হয়ে পরের মতন ভাই ছেড়ে ভাই ক’দিন থাকে?’ ইত্যাদি গান। গানের পঙিক্তর এই মা দেশ, এই মা বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তখন দৃপ্ত শপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তখন তাঁদের অনুপ্রেরণা ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

উৎসবের গানের ফাঁকে ফাঁকে ছিল আবৃত্তি। কবিগুরুর কিছু গান আবৃত্তি করে শোনান শিল্পীরা। রূপা চক্রবর্তী আবৃত্তি করেন ‘মোরা সত্যের ’পরে মন আজি করিব সমর্পণ,/জয়  জয় সত্যের জয়।’ তারপর তিনি একে একে পরিবেশন করেন ‘হবে জয়, হবে জয়, হবে জয় রে,/ওহে বীর, হে নির্ভয়’ এবং ‘বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে,/ছেড়ে যাব তীর মাভৈ-রবে’।

গান ও কবিতার যুগলবন্দিতে গোটা আয়োজন হয়ে উঠেছিল জমজমাট ও প্রাণবন্ত। উৎসবে অংশ নেন রবীন্দ্র একাডেমি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গীতিছত্র, গীতিমায়া সংগীতালয়, গীতি শতদল, ঐহিক শিল্পীগোষ্ঠী, রনতা শিল্পীগোষ্ঠী, ওস্তাদ মোমতাজ আলী সংগীত একাডেমি, আনন্দন, কচি-কাঁচার মেলা, বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংসদ, সুর সপ্তক, ছায়ানট, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ইত্যাদি সংগঠনের শিল্পীরা। আবৃত্তি করেন আশরাফুল আলম, বেলায়েত হোসেন, রূপা চক্রবর্তী ও বুলবুল মহলানবীশ।


মন্তব্য