kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

দলীয় প্রতীক আর ভাবমূর্তির লড়াই

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দলীয় প্রতীক আর ভাবমূর্তির লড়াই

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নগরের যানজট, জলাবদ্ধতা, মাদক বিস্তারের পাশাপাশি বর্ধিত এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনায় নিয়েছেন ভোটাররা। প্রার্থীদের প্রচারের শেষ সময়ে এসে তাঁরা বিগত পাঁচ বছরে পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব মেলাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রার্থীদের প্রতীক ও ব্যক্তি ভাবমূর্তিও বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে; যেখানে লড়াইটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মধ্যেও এগিয়ে থাকার বিষয় আছে, যা ধারণা করা যায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে।

ভোটার ও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা বলছে, ব্যক্তি ভাবমূর্তিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এগিয়ে আছেন। কেউ কেউ বলছে, তাঁর ভাবমূর্তির সঙ্গে যোগ হবে লাঙল প্রতীক। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবেচনায় এগিয়ে রাখছে কেউ কেউ। বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে ব্যক্তি ভাবমূর্তি ও জামায়াতের ভোটের হিসাব আছে কারো কারো বিবেচনায়।

এবারের নির্বাচনে সাতজন মেয়র প্রার্থীসহ মোট ২৮৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ২১১ জন এবং ১১টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ৬৫ জন। মেয়র পদের সাতজন প্রার্থী হলেন—আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু (নৌকা প্রতীক) জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা (লাঙ্গল প্রতীক), বিএনপির কাওছার জামান বাবলা (ধানের শীষ প্রতীক), স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ (হাতি প্রতীক), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী সেলিম আখতার (আম প্রতীক), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আব্দুল কুদ্দুস (মই প্রতীক) ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী এ টি এম গোলাম মোস্তফা (হাতপাখা প্রতীক)।

জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করা রংপুর শহর উন্নয়নে অনেক প্রকল্পই এখনো অর্ধসমাপ্ত। পুরনো পৌরসভা এলাকার ১৫টি ও বর্ধিত এলাকার ১৮টি ওয়ার্ড মিলে এই সিটির জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে ভোটার রয়েছেন তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন।

রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বিগত পাঁচ বছরে রংপুর সিটিতে ২৯৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। আরো প্রায় দেড় শ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে শহরের শাপলা চত্বর থেকে তাজহাট হয়ে মাহিগঞ্জ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়কের কাজও চলমান। তবে মেট্রোপলিটন সিটি না হওয়ার কারণে বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা এখনো নাজুক।

আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রতীকে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হবেন এবার। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত রংপুরে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ব্যক্তি ভাবমূর্তি কাজে লাগাতে যথেষ্ট তৎপর। বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন।

ভোটাররা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতেও এখানে নৌকা ও লাঙ্গলের মধ্যে লড়াই হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতের একটি ভোটব্যাংক রয়েছে এখানে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী থাকলেও জামায়াতের ভোট নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। কারণ, আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে জামায়াতের এই ভোট ধানের শীষের পরিবর্তে লাঙ্গলের পক্ষে যেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছে।

বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রংপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর প্রধান সমন্বয়কারী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দাবি, নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে লাঙ্গল আর ধানের শীষের মধ্যে। কারণ তাঁর ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ব্যক্তি-ইমেজ খুবই খারাপ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটাররা এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে।’ সে বিবেচনায় লাঙ্গল আর ধানের শীষের প্রার্থীর ভাবমূর্তি অনেক ভালো বলে দাবি করেন তিনি।

তবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক। কারণ, সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে জননেতা হিসেবে স্বীকৃত। ব্যক্তি-ইমেজে ঘাটতি থাকলে কেউ জননেতা হতে পারে না।’ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সংশয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিএনপির অভিযোগ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। তাঁরা নিজেরাই নানা অপকর্মে যুক্ত থেকে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর মহানগর সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের বাসিন্দারা কর দিলেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছে। যদিও পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তবে তা এখনো দৃশ্যমান নয়। একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে পাঁচ বছর মোটেও যথেষ্ট নয়।’ এবারের ভোটে একজন সৎ, যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থী নির্বাচিত হবেন বলে তিনি মনে করেন।

সদ্য বিদায়ী মেয়র ঝন্টু একজন দক্ষ প্রশাসক—এ কথা স্বীকার করলেও ফখরুল আনাম বেঞ্জু এর পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে আরো বিনয়ী আচরণ আশা করেন।

মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও রংপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সদরুল আলম দুলু সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারে সরকারি দলের বিশেষ কোনো সুবিধা নেননি। তাই সুষ্ঠু ভোট নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস অমূলক।’

সদরুল আলম আরো বলেন, ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি ঝন্টুর প্রচারে প্রাধান্য পেলেও তাতে ভোটের অঙ্কে বিশেষ প্রভাব নাও পড়তে পারে। কারণ জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ব্যক্তি-ইমেজে সরকারি দলের প্রার্থীর চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। তাঁর সঙ্গে যোগ হচ্ছে রংপুরে দীর্ঘদিন ধরে লাঙ্গল প্রতীকের ইমেজ।’

বিগত নির্বাচনে ভোটের হিসাব তুলে ধরে দুলু বলেন, ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম ভোটে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে হাঁস প্রতীক নিয়ে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সমর্থিত আরেক প্রার্থী আবদুর রউফ মানিক পেয়েছিলেন ৩৭ হাজার ভোট। সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু এক লাখ ছয় হাজার ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাটিত হন। এবারের নির্বাচনে মানিক মাঠে নেই। জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী হয়ে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মোস্তফা। এ ছাড়া বিএনপির কাওছার জামান বাবলা প্রথমবারের ওই নির্বাচনের আগের দিন রাতে ভোট বর্জনের পরও ২১ হাজার ২৩৫ ভোট পেয়েছিলেন।

রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, ‘বিগত পাঁচ বছরে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে রংপুর শহরের চেহারাই পাল্টে যাবে।’ রংপুরবাসী উন্নয়নের স্বার্থেই নৌকা প্রতীকে ভোট দেবেন বলে তিনি দাবি করেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচনে প্রচারণার সময় প্রায় শেষ।’ একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সবার সঙ্গে তিনিও আশাবাদী বলে জানান।

প্রার্থীদের সম্পর্কে সুজনের তথ্য : প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কার বিরুদ্ধে কী পরিমাণ মামলা ছিল বা আছে, এসব তুলে ধরে গত রবিবার তথ্যভিত্তিক সংবাদ সম্মেলন করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজন জানায়, মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ফৌজদারি মামলা রয়েছে আবদুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি মামলা ছিল। কাওছার জামান বাবলার বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, অতীতেও ছিল। সাত মেয়র প্রার্থীর মধ্যে দুজন স্নাতকোত্তর, তিনজন স্নাতক ও দুজন উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ডিগ্রিধারী।

অন্যদিকে ২১১ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৫২ জনের বিরুদ্ধে মামলা আছে। ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল। ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৮১ জনই মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি; ৪৪ জন মাধ্যমিক (এসএসসি) ও ৪১ জন এইচএসসি পাস করেছেন। স্নাতক ডিগ্রিধারী ৩২ জন, স্নাতকোত্তর ১০ জন। ১১টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জনই মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। ১৭ জন এসএসসি এবং আটজন এইচএসসি পাস। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর করেছেন আটজন।

রংপুর চেম্বার মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মেয়র প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া আয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

সুজন জানায়, প্রার্থীরা তাঁদের হলফনামায় যেসব তথ্য দিয়েছেন তা নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে পারে, প্রয়োজনে প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল, এমনকি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরেও ফলাফল বাতিল করতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের রংপুর অঞ্চলের সমন্বয়কারী রাজেন দে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সুজনের রংপুর অঞ্চলের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন ও মহানগর শাখার সভাপতি ফখরুল আনাম প্রমুখ।

 

 

 



মন্তব্য