kalerkantho


হেলালের জবানিতে হত্যার বর্ণনা,নেপথ্য রহস্যাবৃত

এস এম আজাদ   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হেলালের জবানিতে হত্যার বর্ণনা,নেপথ্য রহস্যাবৃত

রাজধানীর বনানীতে জনশক্তি রপ্তানিকারক সিদ্দিক হোসেন মুন্সী ওরফে এস মুন্সীকে তাঁর অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যার পুরো বর্ণনা দিয়েছেন বাড্ডার সন্ত্রাসী হেলাল উদ্দিন। গতকাল রবিবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি হত্যার বর্ণনা দেন।

হেলালের ভাষ্য মতে, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সুইডেনপ্রবাসী ছাত্রদল নেতা নাহিদের নির্দেশে তিনিসহ সাতজন এস মুন্সীকে হত্যা করেছে। টাকার জন্য এই হামলা করেছিলেন দাবি করে হেলাল বলেছেন, এস মুন্সীকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না তাঁদের। 

তবে হেলালের জবানবন্দিতে হত্যার বিবরণ পাওয়া গেলেও কারণ এখনো পরিষ্কার নয় বলে বলছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সে ক্ষেত্রে অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার হলে জিজ্ঞাসাবাদে এবং ভিন্ন সূত্রে এটি পরিষ্কার হওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গত ১৪ নভেম্বর রাতে বনানীর বি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে ১১৩ নম্বর বাড়ির নিচতলায় নিজ প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস মুন্সী ওভারসিজে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন এস মুন্সী। এ ছাড়া তাঁর তিন সহকর্মী মোস্তাক, পারভেজ ও মোখলেসুর গুলিবিদ্ধ হন।

হেলালের ভাষ্য মতে, এই খুনে মোট আটটি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে পাঁচটি উদ্ধার করেছে ডিবি। খুনে অংশ নেওয়া অন্য আসামিরা হলেন নূরী, সাদ্দাম হোসেন, আলামিন ওরফে পিচ্চি আলামিন, শরীফ, আরিফ ও নূরা। এর মধ্যে নূরীর কাছে দুটি অস্ত্র ছিল।

হেলাল জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার এক মাস আগে সুইডেনপ্রবাসী নাহিদ মোবাইল ফোনে তাঁকে বনানীর এস মুন্সী ওভারসিজে গুলি করে হামলার নির্দেশনা দেন। হেলাল পরে নূরীর সঙ্গে চুক্তি করেন। এরপর ছয় সহযোগীকে জড়ো করা হয়। হত্যার ১০-১২ দিন আগে তাঁরা ঘটনাস্থল রেকি করেন। তখন হেলালের কাছে ১০ হাজার টাকা পাঠান নাহিদ। এর পাঁচ হাজার টাকা নূরীকে দেন হেলাল। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্রের জোগান দেন হেলাল ও নূরী। নাহিদ তাঁদের বলেন, ওই অফিসে গুলি করে লুট করলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে।

ঘটনার আগে হেলাল বনানীর ২৩ নম্বর রোডের মাথায় অবস্থান নেন। সহযোগীরা এস মুন্সী ওভারসিজে ঢুকে গুলি করেন। টাকা লুটের চেষ্টা করলেও তাঁরা অফিসে তেমন কোনো টাকা পাননি। নির্দেশনা অনুযায়ী, খুনিরা দ্রুত বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে তারা হেলালকে গুলির বিষয়টি জানালে তিনি মোবাইল ফোনে নাহিদকে বলেন, ২০-২৫ রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। পরে তাঁদের মধ্যে ভিডিও চ্যাটিং অ্যাপস ইমোতে কথা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সবাই গুলশানে জাকিরের দোকানে গিয়ে মাংস-রুটি খায়। এরপর যে যার মতো চলে যায়।

গুলি ও হত্যার পর হেলালকে আরো টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন নাহিদ। তবে সে টাকার পরিমাণ জানাননি হেলাল।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, সুইডেনপ্রবাসী নাহিদ কেন হত্যা বা গুলির কথা বললেন এবং হেলালকে মনোনীত করলেন, এটা এখনো পরিষ্কার নয়। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের ধারণা দুটি। এক. ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে কেউ নাহিদকে ভাড়া করেছিল। দুই. চাঁদাবাজির জন্য হুমকি হিসেবে এ ঘটনা ঘটতে পারে।

ডিবির সূত্র জানায়, গত ৮ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেন ও আলামিন ওরফে পিচ্চি আলামিন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও অপর আসামিরা এখনো পলাতক। এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিস্তারিত জানা গেলেও খুনের কারণ বা মোটিভ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা থেকে গেছে। হত্যার পেছনে টাকা লুট ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল কি না, তা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) গোলাম সাকলাইন সিথিল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আসামি হেলাল রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানিয়েছেন। হেলাল জানিয়েছেন, নাহিদ ও তিনি মিলে এ পরিকল্পনা করেন। টাকার জন্য তাঁরা বানানীর এস মুন্সী ওভারসিজে গুলি চালান। জবানবন্দিতে হত্যার বিবরণ পাওয়া গেলেও কারণ এখনো পরিষ্কার হওয়া যাচ্ছে না।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম সারাফুজ্জামান আনছারী তাঁর খাসকামরায় হেলালের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার বিধি অনুযায়ী রেকর্ড করেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।

গত ৫ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর গুলশানে কালাচাঁদপুর এলাকা থেকে পাঁচটি অস্ত্রসহ হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় পুলিশের কাউন্টার টোররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট আদালতের মাধ্যমে তাঁকে দুই দফায় চার দিনের রিমান্ডে নেয়। পরে তাঁকে এস মুন্সী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল তিনি স্বীকারোক্তি দেন।

 



মন্তব্য