kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

ঝন্টু-মোস্তফার মরিয়া প্রচার

জামায়াত ও তরুণদের দিকে তাকিয়ে বাবলা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঝন্টু-মোস্তফার মরিয়া প্রচার

হাতে সময় কম। আজ রবিবার গেলে নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিন দিন। আর প্রার্থীরা প্রচার চালানোর সময় পাচ্ছেন মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত। তাই ভোটারদের মন জয় করতে শেষ বেলায় মরিয়া রংপুর সিটি নির্বাচনের প্রার্থীরা। এখনো যে এলাকাগুলোয় প্রচার চালানো যায়নি সেগুলোকেই টার্গেট করে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।

এদিকে গতকাল শনিবার বিজয় দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে নির্বাচনী আমেজ লক্ষ করা গেছে।

আগামী ২১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রংপুর সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে প্রার্থী ও ভোটাররা হিসাব-নিকাশ শুরু করে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী তিন বড় দলের মেয়র প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা তাদের। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী সাতজন। এ ছাড়া কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে প্রার্থী আছেন ২৭৬ জন।

মেয়র পদের প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের হলেন সদ্য সাবেক মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। জাতীয় পার্টি ও বিএনপির প্রার্থী হলেন যথাক্রমে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও কাওসার জামান বাবলা। অন্য চার প্রার্থী হলেন স্বতন্ত্র হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ (হাতি প্রতীক), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সেলিম আখতার (আম প্রতীক), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আব্দুল কুদ্দুস (মই প্রতীক) ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের এ টি এম গোলাম মোস্তফা (হাতপাখা প্রতীক)।

প্রচারে বড় তিন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা : আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও তথ্য গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে দুটি দল রংপুরে আসে। ওইদিন সন্ধ্যা থেকে তাঁরা ঝন্টুর সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী পথসভায় অংশ নেন। এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি জানান, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীসহ দলীয় কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে দলীয় নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করেছেন। বিজয় দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় ফিরেছেন। আজ রবিবার আরও কেন্দ্রীয় নেতা আসার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম মিজু জানান, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বুধবার রংপুরে এসে বেশ কয়েকটি নির্বাচনী পথসভায় যোগ দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য দেন। পর্যায়ক্রমে আরও দলীয় নেতারা রংপুরে এসে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেবেন। এছাড়া রংপুর জেলা ও মহানগর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই নির্বাচনী প্রচার মাঠে থাকছেন।

গতকাল শনিবার রংপুরে মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতেও দেখা গেছে নির্বাচনী আমেজ। প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণসহ সিটির বিভিন্ন এলাকায় নানা অনুষ্ঠানে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি প্রায় সব মেয়র প্রার্থী তাঁদের সমর্থকদের নিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তাঁরা। বিশেষ করে প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সময় দিয়েছেন।

নির্বাচনী মাঠে সমীকরণ: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিকে মাথায় রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি জটিল সমীকরণ নিয়ে মাঠে নেমেছে। চুলচেরা বিশেষণ করছে দল দুটি। শেষ মুহূর্তে এসে কোন শ্রেণির ভোট অথবা কোন ওয়ার্ডে বেশি ভোট পাওয়া যাবে, তা নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা জামায়াতের ও তরুণ ভোটারদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। জামাতের ৬০ হাজার, তরুণ প্রজন্মের ৩৬ হাজার এবং গত নির্বাচনে পাওয়া বিএনপির ২১ হাজার ভোটার ধরে রাখতে পারলে জয় তাঁর হাতের মুঠোয় আসবে বলে মনে করছেন বাবলা।

সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ক’দিন আগেও নির্বাচনী মাঠে বিএনপির প্রার্থী অনেকটা পিছিয়ে ছিলেন। সমপ্রতি দলটির প্রচারে এগিয়ে গেছেন ধানে শীষের বাবলা। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা রংপুরে এসে তাঁর পক্ষে প্রচার শুরু করেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পাড়া-মহলায় ধানের শীষের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।

জাতীয় পার্টি তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে। আর আওয়ামী লীগও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে মাথায় রেখে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা রংপুরে এসে ঝন্টুর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে এগিয়ে থাকা তিন প্রার্থীই তাঁদের কৌশল অনুযায়ী নতুন প্রজন্মের ৩৬ হাজার ভোটারসহ জামায়াতের ৬০ হাজার, সংখ্যালঘু ৬৫ হাজার ও অবাঙালি ২৫ হাজার ভোটার তাঁদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তরুণদের ভোট টানতে নৌকা ও লাঙ্গলের নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটি নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তরুণ এ প্রজন্ম ডিজিটাল-নির্ভর হওয়ায় ডিজিটাল মাধ্যমকেই সঠিক পদ্ধতি মনে করছে তারা। দুই পক্ষই  ফেসবুক, টুইটার আর ইউটিউবে প্রচার চালাচ্ছে। ঝন্টুর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র ‘উন্নয়নের মহাসড়ক’ তাঁর সমর্থকরা ব্যাপকভাবে ফেসবুকে শেয়ার করছে। একইভাবে তরুণ  ভোটারদের কাছে টানতে মোস্তফার সমর্থকরাও ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। সেখানে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনার চিত্রসহ প্রতিশ্রুতিসংবলিত পেজ খোলা হয়েছে।

নগরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মন্টু মিয়া বলেন, ‘দলীয় প্রতীকে প্রথম রংপুর সিটির নির্বাচন হচ্ছে। তাই দেখেশুনে যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে চাই। তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ঝন্টু, মোস্তফা ও বাবলার মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।’

জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। উপজেলা নির্বাচনের সময়ও রংপুরের মানুষ আমাকে ভালোবেসে নির্বাচিত করেছিল, আশা করি এবারও নিরাশ করবে না।’

আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু বলেন, ‘নৌকা উন্নয়নের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছার কারণেই রংপুরের উন্নয়ন হয়েছে। মানুষ চায় উন্নয়ন। তাই রংপুর সিটির নির্বাচনে নৌকা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’

বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা বলেন, ‘দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়াসহ সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পরও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচনে আবারও সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটাররা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে তাঁর বিজয় নিশ্চিত হবে।’

নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন : রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে উত্তেজনা। নগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবেদ আলী সরকারের পূর্ব বড়বাড়ী ডারারপাড় এলাকার নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ভোরে এ আগুনের ঘটনায় তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ের সামিয়ানা, পোস্টার পুড়ে গেছে।

আবেদ আলী সরকার বলেন, সমর্থকদের মাধ্যমে ঘটনা জানার পর তিনি রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার, পুলিশ সুপার ও কোতোয়ালি থানাকে জানিয়েছেন। কারো নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কায় প্রতিপক্ষরা আমার অফিসে আগুন দিয়েছে।’

এ ব্যাপারে কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিয়া জানান, মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানার পরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে সিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে কুপিয়ে জখম করেছে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। এ ব্যাপারে মামলা হলে পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।



মন্তব্য