kalerkantho


‘নিশ্চিন্ত’ আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক, বিএনপির ১

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘নিশ্চিন্ত’ আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক, বিএনপির ১

সুন্দরী সুন্দরবনঘেঁষা দাকোপ এবং খুলনা শহরসংলগ্ন বটিয়াঘাটা—এই দুই উপজেলা নিয়ে খুলনা-১ আসন গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ৯৯ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। এই আসনের ভোটারদের মধ্যে সংখ্যালঘু সদস্যদের আধিক্য থাকায় এটি বরাবরই আওয়ামী লীগের নিশ্চিত আসন হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যতবার আওয়ামী লীগ অংশ নিয়েছে ততবারই এখানে দলটির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তবে একবার আওয়ামী লীগের একজন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জয়লাভ করেন; অবশ্য তিনি জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের হয়েই শপথ পড়েন।

আওয়ামী লীগের নিশ্চিত আসন হওয়ায় এখানে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকেই। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাসসহ ছয়জন মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন। বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন; যিনি আগেও এই আসন থেকে নির্বাচন করেছেন, সেই আমীর এজাজ খানের ওপরই দলটির ভরসা। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পঞ্চানন বিশ্বাস ৬৬ হাজার ৯০৪ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ননীগোপাল মণ্ডল। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ‘বিদ্রোহী’ হয়ে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৫২৭। যদিও নবম সংসদ নির্বাচনে ননীগোপাল পেয়েছিলেন এক লাখ ২০ হাজার ৮০১ ভোট। তখন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৬৮ হাজার ৪০২।

আওয়ামী লীগ : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হলেন আওয়ামী লীগ নেতা পঞ্চানন বিশ্বাস। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালে এবং ২০১৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে মূলত দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে সংখ্যালঘু মুখ হিসেবেই নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। সেবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলের খুলনা জেলা শাখার সভাপতি শেখ হারুনার রশিদ। তিনি এর আগেরবার ১৯৯১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে স্বচ্ছ। তবে তাঁর প্রতি এলাকার মানুষের, বিশেষ করে দাকোপ উপজেলার নানা স্তরের মানুষের ক্ষোভও বিস্তর। এই ক্ষোভের কারণ দুর্যোগ-দুর্ভোগে পড়া মানুষগুলোর জন্য যথাসময়ে কিছু করতে না পারা। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলায় আক্রান্ত কামারখোলা-সুতারখালী এলাকার সহস্রাধিক পরিবার এখনো ভিটেমাটি হারিয়ে রাস্তায় বসবাস করে। তাদের পুনর্বাসন করা হয়নি। এ নিয়ে সংসদ সদস্যের প্রতি তাদের ক্ষোভ আছে। অনেকেই বলাবলি করছে, বটিয়াঘাটার মানুষ সংসদ সদস্য পঞ্চানন দাকোপের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের প্রতি নজর দিচ্ছেন না। অনেকেই এই দাকোপ ও বটিয়াঘাটার বিভাজনটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে পঞ্চানন বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যতটুকু করা যেতে পারে, তিনি ততটুকু করার চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এলাকার অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়েছে, মানুষ উপকৃত হয়েছে। তিনি যেমন মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী, তেমনি এলাকাবাসীও তাঁকে নির্বাচিত করবে বলে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী।

বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাসের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনার রশিদ এবং এর আগেরবার অর্থাৎ ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়লাভকারী ননীগোপাল মণ্ডল।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে শেখ হারুনার রশিদও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তবে তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান পদে থাকা। দল তাঁকে নির্বাচিত ওই পদ থেকে সরিয়ে এনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ দেবে কি না সেটিও এক বিরাট প্রশ্ন।

জানতে চাইলে খুলনা জেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনার রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুলনায় মোট ছয়টি আসন। এর মধ্যে শহরে দুটি এবং জেলায় চারটি। জেলার চারটি আসনের মধ্যে যেকোনো আসনেই যদি নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের জন্য আমাকে মনোনীত করেন, তবে সেখানেই নির্বাচন করতে রাজি। আর খুলনা-১ আমার নিজের আসন। বটিয়াঘাটায় আমার জন্ম। আমি সেখানকার এমপি ছিলাম।’

ননীগোপাল মণ্ডল আবারও মনোনয়ন পাওয়ার জন্য জোরেশোরে মাঠে নেমেছেন। গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। এ কারণে দল থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন। পরে দল বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এ তিনজনের বাইরে শক্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন আওয়ামী লীগের দাকোপ উপজেলা শাখার সভাপতি ও দাকোপ উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আবুল হোসেন। বিশিষ্ট চিংড়ি চাষী আবুল হোসেন ১৯৮৩ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

আবুল হোসেন সমর্থকদের প্রধান যুক্তি হচ্ছে, দাকোপ-বটিয়াঘাটার চিরায়ত ভোটের রাজনীতির অঙ্ক এরই মধ্যে পাল্টে গেছে। এই সংসদীয় এলাকায় এখন আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের একাধিপত্য নেই। এখন বটিয়াঘাটা এলাকায় নতুন বসতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি। ফলে সংখ্যালঘু মুখ এখন আর এখানকার নির্বাচনে প্রধান বিবেচ্য নেই। বরং সংখ্যালঘু মুখ বিবেচনায় আনলে ভোটের ফলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা বিরোধী গোষ্ঠী সুবিধা পেতে পারে।

এ ছাড়া বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম খান ও বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন মণ্ডল মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে।

আবার আওয়ামী লীগের অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলও এই আসনের প্রার্থী হতে পারেন। অবশ্য একটি পক্ষ তাঁকে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করে। কিন্তু একেবারে শতভাগ ব্যবসায়ী এই মানুষটি সিটি করপোরেশনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হতে আগ্রহী নন। কারণ পদটিতে একেবারে ২৪ ঘণ্টার গত্বাঁধা কাজ থাকে। সে ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। তাই অনেকেই তাঁকে সংসদ সদস্য হিসেবে পেতে চান এবং সে ক্ষেত্রে খুলনা-১ আসনটি উপযুক্ত বলে মনে করেন।

বিএনপি : বলতে গেলে একক প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে আছে বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০ দলীয় জোটগতভাবে নির্বাচন হলেও এখানে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী দলের খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান। বিগত দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তিনি প্রার্থী হলেও পরাজিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ দুর্গে আঘাত হানতে তিনি যোগ্যতম প্রার্থী বলে দল মনে করে।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা শাখা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা কালের কণ্ঠকে বলেন, খুলনা-১ আসনে তাঁদের প্রার্থী দলের খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান। এ ছাড়া সেখানে আর কেউই নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার মতো নেই। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে তাঁদের দলীয় প্রার্থী জয়লাভ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অন্যান্য : এ ছাড়া বর্তমান সংসদের বিরোধী দল সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সুনীল শুভরায় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দলের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব।

এ আসনে ইসলামী দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম তেমন একটা দেখা না গেলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের প্রার্থী হিসেবে আবু সাঈদকে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে বলেছে।

 

 


মন্তব্য