kalerkantho


নিরাপত্তা পরিষদকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত

রোহিঙ্গা নৃশংসতা বন্ধের আহ্বান জানাতেই হবে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা নৃশংসতা বন্ধের আহ্বান জানাতেই হবে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নারীদের ভয়ংকর যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার তথ্য তুলে ধরে দ্রুত নৃশংসতা বন্ধের আহ্বান জানাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে তাগিদ দিয়েছেন যৌন সহিংসতাবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত প্রমিলা প্যাটেন। গত মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তিনি এ তাগিদ দেন। বৈঠকে জাতিসংঘের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফরি ফেল্টম্যান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানান, এখনো মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা আসা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের প্রতিনিধি জোর দেন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায়। গত মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত সভাপতির বিবৃতির আলোকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ২টা ২০ মিনিটে নিউ ইয়র্কে শুরু হওয়া নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক চলে ভোর ৪টা ২১ মিনিট পর্যন্ত। বৈঠকে প্রমিলা প্যাটেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার আলোকে নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, যেসব রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তাদের প্রত্যেকেই ভয়ংকর যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার বা প্রত্যক্ষ করার, এমনকি ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হওয়ার দৃশ্য দেখার কথা জানিয়েছে। তিনি বলেন, অত্যন্ত বেদনাদায়ক এসব বিবরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের বড় ধরনের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। নিরাপত্তা ও অধিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করতে হবে।

জাতিসংঘের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফরি ফেল্টম্যান সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় বিবেচনার আহ্বান জানান। এগুলো হলো—মিয়ানমারে সামাজিক পুনর্মিলন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বসতভূমিতেই অথবা বসতভূমির কাছে নিরাপদ ও সুরক্ষিত স্থানে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে শিবিরে রাখা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ভেতর অবাধ চলাফেরার সুযোগ দিতে হবে। মিয়ানমারে ফেরার জন্য যোগ্যতার মাপকাঠি যতটা সম্ভব বিস্তৃত করতে হবে। বর্তমানে বাড়ির ঠিকানা প্রমাণের যে আবশ্যিকতা রাখা হয়েছে তা পূরণ করা অনেক রোহিঙ্গার জন্যই কঠিন হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

জাতিসংঘের মিয়ানমারের প্রতিনিধি হাও ডো সুয়ান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারলে তাঁর সরকার অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেবে। রাখাইন রাজ্যের সমস্যাগুলোর মূল কারণগুলো সমাধানে রূপরেখা হিসেবে মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশনের (আনান কমিশন) সুপারিশগুলোকে আমলে নিয়েছে এবং এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি মিয়ানমার বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সাম্প্রতিক বিবৃতি, সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাব এবং মানবাধিকার পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব নিয়ে তাঁর দেশের আপত্তির কথা জানান। নিরাপত্তা পরিষদের চলতি ডিসেম্বর মাসের সভাপতি জাপানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় পরিষদের সদস্য দেশগুলোর বাইরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পায়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘এখন প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ৪০০ জন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এতে স্পষ্ট হয়, রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি।’ গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রদূত আশা প্রকাশ করেন, চুক্তির শর্তানুযায়ী শিগগিরই যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কেবল প্রত্যাবাসনের কাজটি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক দুর্দশার যে মূল কারণ তা দূর করতে এ সম্পর্কিত বহুবিধ বিষয় ও অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহাযোগিতা ও পর্যবেক্ষণ একান্তভাবে প্রয়োজন। আর তা করতে হবে অসহায় রোহিঙ্গাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে।

চীনের প্রতিনিধি ওয়াও এআই তাইও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনাকে উৎসাহিত করা। রাখাইন রাজ্যের সমস্যার সঙ্গে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। সেখানে রাতারাতি কোনো সমাধান আসবে না। নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে দিয়ে চীনা প্রতিনিধি বলেন, স্বল্প মেয়াদে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রাশিয়ার প্রতিনিধি ভাসিলিয়ে নিবেনজিয়া মিয়ানমারকে দোষী করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতীতের ঔপনিবেশিক প্রশাসনগুলোর কর্মকাণ্ডেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জাপানের প্রতিনিধি এয়াসুহিসা কাওয়ামুরা বলেন, জাপান মিয়ানমারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রশংসার পাশাপাশি তিনি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান।

যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি জনাথন গাই অ্যালেন প্রত্যাবাসন চুক্তিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হ্যালি জোর ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ প্রত্যাখান করেছে এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করছে না। ফ্রান্সের প্রতিনিধি ফ্র্যাসোয় দোঁলাত মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 



মন্তব্য