kalerkantho


সহযোদ্ধার লাশ পাশে রেখে হত্যা করি হানাদার

ইয়াদুল মোমিন   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সহযোদ্ধার লাশ পাশে রেখে হত্যা করি হানাদার

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম

কালের কণ্ঠকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় যুদ্ধদিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। ৬৫ বছর বয়সী এই বীর সেনা আজ ভালো নেই। স্বাধীন দেশে তাঁর জীবনযুদ্ধই শুরু হয়েছিল মুদি দোকান ও চাষাবাদের জীবনযাপনে। বর্তমানে তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অর্থ কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন। মেয়েটা স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে মাস্টার রোলে আয়ার কাজ করেন। সিরাজুল ইসলামের জানা নেই, মেয়েটার চাকরি কখনো স্থায়ী হবে কি না। বড় ধরনের কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর পাশে থেকেই শহীদ হন সহযোদ্ধা ওয়ালিউল বারি। তাঁর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে এলএমজি দিয়ে ঘায়েল করেছেন পাকিস্তানি সেনাদের। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি দিয়ে যুদ্ধ করেছেন এই বীর যোদ্ধা।

স্মৃতিতে একাত্তর : “আনসারের ট্রেনিং ছিল। তাই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরদিন তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার ‘এসডিও’ তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী আমাকে বাড়ি থকে তুলে নিয়ে আসেন। মেহেরপুর এসে দেখি শত শত আনসার, ইপিআর ও মুজাহিদ নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে যেখানে রেজিস্ট্রি অফিস সেখানে তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী নিজেই সবাইকে খাওয়ালেন এবং দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে আহ্বান জানালেন। তাঁর কথায় অনুপ্রেরণা বেড়ে গেল। পরদিন আমাদের একটি ট্রাকে করে পাঠানো হয় কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনে, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী আগে থেকেই ক্যাম্প করে রেখেছিল। মার্চ মাসের শেষের দিকে আমরা ৩০ জনসহ আশপাশের মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রায় ২০০ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করি এবং তাদের ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিই। এরপর কুষ্টিয়া থেকে হেঁটে খলিসাকুণ্ডি চলে আসি। সেখান থেকে ট্রাকে করে মেহেরপুরে নিয়ে আসা হয়। মেহেরপুরে চার দিন বিশ্রাম করার পর আমাদের ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছানোর আগ মুহূর্তে দৌলতদিয়ার ব্রিজের কাছে পৌঁছাতেই পাকিস্তানি বাহিনী বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে হামলা চালিয়ে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বেশ কিছু মুক্তিসেনা শহীন হন। প্রাণ বাঁচাতে একেকজন একেক দিকে পালিয়ে যাই। সেখানে থেকে পালিয়ে হেঁটে চলে আসি মেহেরপুরের রাজনগরে।”

“রাজনগরে পৌঁছানোর পরপরই শুনতে পাই পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকটি গাড়িবহর আমঝুপি ফার্মে হামলা চালিয়ে ২০ থেকে ২৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। আগুন ধরিয়ে মালপত্র লুট করে। আমি তখন থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে নিয়ে রাজনগর থেকে মাঠের মধ্যে দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার হেঁটে আমার নিজ বাড়ি বর্তমান সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া নওদাপাড়ায় যাই। কিন্তু বাড়িতে আমার আশ্রয় হলো না। ভয়ে মা-বাবাসহ আত্মীয়রা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। তাঁরা বললেন, আমি থাকলে রাজাকাররা বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে। হাতিয়ারটা কাঁধে নিয়ে না খেয়েই আবার হাঁটা শুরু করলাম। বইকুণ্ডপুর হয়ে পৌঁছালাম শ্বশুরবাড়ি গাড়াবাড়িয়া গ্রামে। সেখানেও আশ্রয় পেলাম না। আনসার ট্রেনিং নেওয়া সদর আলী নামের এক ফুফাশ্বশুর ছিলেন আমার। তিনি আমার সঙ্গে যোগ দিলেন। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে কাথুলী নিলকুঠিতে পৌঁছালাম। ক্ষুধা ও পিপাসা নিয়েই নলকুঠির একটি প্রাচীরে হেলান দিয়ে দুজনে রাত কাটালাম। সকালে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের নদীয়া জেলার কাঁঠালি নন্দপুর পৌঁছালাম।”

“আমাদের দেখতে ভারতের ওই গ্রামের শত শত মানুষ ভিড় জমায়। একপর্যায়ে মুখ খুলে বলি, ‘আমাদের একটু খাবার দিন।  এক হিন্দু মেয়ে এক গামলা ছাতু দেয়। সেই ছাতু খেয়ে যাই বেতাইয়ের ইয়ুথ ক্যাম্পে। প্রশিক্ষক ছিলেন ক্যাপ্টেন এ আর আযম চৌধুরী। তিনি আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, সিরাজ, তুই বেঁচে আছিস। তোকে তো চুয়াডাঙ্গায় মুত্যুর মুখে রেখে এলাম।’ ১৫ দিন পর আমাদের পাঠানো হলো বিহারের চাকুলিয়া ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে ভারতের আর্মি ট্রেনিং করাত। ওখানে এক মাস বিভিন্ন ধরনের ভারী অস্ত্র যেমন—মর্টার, এলএমজি, এসএলআর, এক্সপ্লোসিভ থ্রোয়িং ট্রেনিং করি। এক মাস ট্রেনিং করার মনের শক্তি দ্বিগুণ হয়ে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য মন অস্থির হয়ে গেল। কয়েক দিন পরেই ভারী অস্ত্রসহ পাঠানো হলো নদীয়া জেলার শিকারপুর। এপারে কুষ্টিয়ার ধর্মদহ-প্রাগপুর।”

“ক্যাপ্টেন হালিমের নেতৃত্বে শিকারপুরে তাঁবু তৈরি করে ২৫০ জন মুক্তিসেনা অবস্থান করতে লাগলাম। পাঁচ-ছয় মাস ধরে বামন্দি-প্রাগপুর সড়কের কাজিপুর, ধর্মদহ, তেকালা ব্যাঙগাড়ি মোড়সহ সড়কে ফাঁদ পেতে এলএমজি ব্যবহার করে শত্রুদের ঘায়েল করতে থাকি। যুদ্ধের শেষ দিকে ব্যাঙগাড়ি মোড়ে বাংকারে আমরা প্রায় ৫০-৬০ জন মুক্তিসেনা অবস্থান করছিলাম। পাকিস্তানি সেনারা আমাদের অবস্থান বুঝতে পেরে একদিন রাতে একটা ফাঁকা ফায়ার করে। মুক্তিসেনারা তাদের চ্যালেঞ্জ করে একটি ফায়ার করলে তারা চলে যায়। পরদিন ভোর ৪টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা আমাদের তিন দিক দিয়ে ঘিরে ফেলে অতর্কিত হামলা চালাতে থাকে। হামলায় বহু মুক্তিসেনা, নিরীহ জনগণ শহীদ হন। কিছু পাকিস্তানি সেনাও আমাদের পাল্টা হামলায় জীবন হারায়।”

“বাংকারে আমার সঙ্গে মেহেরপুরের মোনাখালী গ্রামের ওয়ালিউল বারি ও সিদ্দিক নামের এক বিডিআর সদস্য ছিলেন। বাংকারে ২৮টি ম্যাগাজিন আর দুটি বাক্সে গুলি লোড করা ছিল। মনের শক্তি এত বেড়ে গেলে যে কোনোভাবে শত্রুদের ঘায়েল করতে হবে। শুরু করলাম ফায়ার। শতাধিক পাকিস্তানি সেনাকে ঘায়েল করি। আমাদের সঙ্গে থাকা ওয়ালিউল বারি শেষ দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। তিনি বাংকার থেকে একটু উঠে দাঁড়ান আর তক্ষুনি পাকিস্তানি সেনাদের গুলি ওয়ালিউলের চোখ বরাবর লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেখানেই শহীদ হন। এর পরপরই পাকিস্তানি সেনারা আমাদের বাংকারের পজিশন বুঝতে পেরে ১২-১৩ জনের একটি পাকিস্তানি সেনার দল পেছন দিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলে। নির্ঘাত মৃত্যু ভেবে এলএমজি পেছন দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ফায়ার শুরু করি। ফায়ারে তারা সবাই সম্ভবত মারা যায়। ওয়ালিউলের লাশ ফেলে রেখে সিদ্দিকসহ আরো সাতজন মাথাভাঙা নদী সাঁতরে কাজিপুরে শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিই। তখন সকাল ১১টা। পানি খাওয়ার পর দুপুরের দিকে চলে যাই শিকারপুর ক্যাম্পের তাঁবুতে। মুক্তিযোদ্ধারা আমারাদের সেবা করে সুস্থ করে তোলেন। বিকেল ৪টার দিকে এলাকাবাসী ওয়ালিউলের লাশ শিকারপুর ক্যাম্পে দিয়ে আসে। নিজেরা লাশ কাঁধে নিয়ে রাত ১২টার দিকে সেখানেই তাঁকে দাফন করি। এর পরদিন দেশ স্বাধীন হয়। আমরা প্রায় আড়াই শ জন ভেড়ামারার সাতবাড়িয়া ক্যাম্পে গিয়ে অবস্থান করি। ট্রাকে করে চুয়াডাঙ্গা বিডিআর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। দুই মাস ছিলাম। আমরা ধরে নিয়েছিলাম আমাদের চাকরি হয়ে গিয়েছে। পরে যশোরে আনসার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে যাওয়ার পর একটুর জন্য ট্রেন ফেল করি। তখন ভাবলাম, ট্রেন যখন ফেল করলাম তাহলে একটু মায়ের মুখটা দেখে আসি। মায়ের মুখ দেখতে বাড়ি গিয়ে আর চাকরিতে যাওয়া হলো না। ম-বাবা আর ছাড়লেন না। আমার জন্য মা একটি খাসি মানত করেছিলেন। ফিরে এলে জবাই করে সবাইকে খাওয়াবেন। মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজনদের কাছে শুনেছিলাম গ্রামের কিছু রাজাকার তাদের ওপর অত্যাচার করেছে, গালাগাল করেছে। সেই রাজাকার আলাউদ্দিন খাঁ, সালাউদ্দিন খাঁ, সুফিয়ানরা যখন শহরে বুক ফুলিয়ে চলে তাদের দেখে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।”

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি যাঁরা যুদ্ধ করেনি তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসে আছেন। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তাঁদের ছেলেমেয়েরা চাকরি করছে। রাজাকার-আলবদরদের সন্তানরা আজ রাজনৈতিক দলের বড় বড় পদে রয়েছে। এসব দেখার জন্য তো যুদ্ধ করিনি।’ তিনি জানান, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। দুই ছেলে গ্রামে মুদি দোকান দিয়ে চলে, এক ছেলে চাষাবাদ করে। স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ের আয়ার চাকরি এখনো স্থায়ীকরণ হয়নি। আরেক মেয়ের স্বামী ঘরে। তবে তাঁর শেষ চাওয়া হচ্ছে—‘বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজাকারদের বিচার শুরু করেছেন। কোনো রাজাকার যাতে বুক ফুলিয়ে চলতে না পারে সে ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।’

 



মন্তব্য