kalerkantho


নিউ ইয়র্কে বিস্ফোরণ, আকায়েদ গ্রেপ্তার

ট্রাম্পের খড়্গ বাংলাদেশিদের ওপর পড়ার শঙ্কা, আতঙ্ক

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ট্রাম্পের খড়্গ বাংলাদেশিদের ওপর পড়ার শঙ্কা, আতঙ্ক

ছবি: ইন্টারনেট

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটান পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহ (২৭) গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আকায়েদ একসময় ট্যাক্সি চালাতেন এবং সর্বশেষ ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছিলেন। আর নিউ ইয়র্কে প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী ট্যাক্সি ও উবার চালক রয়েছেন।

তা ছাড়া ওই বিস্ফোরণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন আইন আরো কঠোর করার কথা জানানোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে।

ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের জন্য অভিবাসন আইন সংস্কার করা কতটা জরুরি নিউ ইয়র্কে বোমা হামলার ঘটনা সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে।

আকায়েদের ফ্যামিলি ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘এক্সটেনডেন্ট ফ্যামিলি চেইন মাইগ্রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই যুবক যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল।’ ওই অভিবাসননীতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ওই নীতি পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচিত অভিবাসন আইন সংস্কার করা।’ তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার সময়ই আমি বলেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতির ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। কেননা এর মাধ্যমে অনেক ভয়ংকর ব্যক্তি পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়ছে।’    

এরই মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছয় দেশ—ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন ও চাদের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ওই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

এদিকে গত সোমবার বাস টার্মিনালে বোমা বিস্ফোরণের পর বেশির ভাগ প্রবাসী ট্যাক্সিচালকই গাড়ি নিয়ে নামেননি। যাঁরা এরই মধ্যে রাস্তায় ছিলেন তাঁদের অনেকেই আর ম্যানহাটনমুখী হননি বলে জানা গেছে।

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের বাসিন্দা আতাউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ট্যাক্সি চালান। এখন ট্যাক্সির পাশাপাশি উবার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একটি খারাপ খবর শোনার পর গাড়ি চালাতে যেতে আর মন টানছে না। কিন্তু এ পেশা ছাড়া অন্য কোনো কাজ কখনো করিনি। এ কাজ না করলে কিভাবে দিন চলবে সেটাই ভাবছি। একজন ব্যক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রবাসী বাংলাদেশির সমস্যা সৃষ্টি হোক, এটা কিভাবে সহ্য করা যায়।’

জামাইকায় বসবাসকারী শামীম হোসেন নামের একজন ট্যাক্সিচালক বলেন, ‘কোনো কারণে যদি পুলিশ গাড়ি আটক করে ফেলে, তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য দিয়ে আমার চৌদ্দ গুষ্টির খবর সংগ্রহ করবে। আমি কিভাবে লুকিয়ে রাখব আমার মাতৃভূমির নাম। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ম্যানহাটনের ঘটনায় যেহেতু বাংলাদেশি জড়িত থাকার কথা প্রকাশ পেয়েছে, সেহেতু গাড়ি চালাতে এখন ভীষণ ভয় লাগছে। কখন কী হয় বলা তো যায় না।’

ব্রংকস এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হাকিম নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। তিনি বলেন, ‘নিউ ইয়র্কের পত্রপত্রিকায় যখন প্রবাসীদের কোনো ভালো খবর দেখি তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়। তাদের কোনো দুঃসংবাদে নিজের মাথা নিচু হয়ে যায়। আমেরিকান সচেতন ট্যাক্সিযাত্রীদের কাছে গর্ব করে কথা বলতে পারি না। ভীষণ লজ্জা লাগে। তবে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তার উচিত শাস্তি হোক, সে যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন।’

খোদ ম্যানহাটনের প্রবাসী ট্যাক্সিচালক জুবায়ের আহমেদ জানালেন তাঁর জীবনের নানা দুঃখের কথা। পাঁচ বছর ধরে ম্যানহাটনে গাড়ি চালানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে পদে পদে বিপদ। গাড়ি চালাতে সামান্য ত্রুটি হলেই পুলিশ এসে আটক করে মোটা অঙ্কের একটা জরিমানার টিকিট ধরিয়ে দেয়। তারা জরিমানার টিকিট লেখার সময় লাইসেন্স নম্বর দিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই চালকদের সমস্ত ব্যাকগ্রান্ড চেক করে ফেলে। কিছু খুঁজে পেলেই নানা প্রশ্নও করে। দেশ বা ধর্মের কথা জিজ্ঞেস না করলেও তারা সেটা জানতে পারে কে কোন দেশের নাগরিক।’

জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘ম্যানহাটনের ঘটনার পর থেকে পুলিশ আরো কড়াকড়ি পদক্ষেপ নেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ কারণে অন্য কোনো দেশের ট্যাক্সি বা উবার চালকদের কোনো সমস্যা না হলেও বাংলাদেশিদের সমস্যা হবে, এটা নিশ্চিত। এ কারণে শুধু আমি না, নিউ ইয়র্কের হাজার হাজার বাংলাদেশি ট্যাক্সি ও উবার চালক ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।’

জ্যাকসন হাইটসের পাশের উডসাইডের বাসিন্দা ও ট্যাক্সিচালক বদিউজ্জামান বলেন, ‘ম্যানহাটনের বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণকারী হিসেবে বাংলাদেশির নাম প্রকাশের খবর শোনার পরও আমি গাড়ি চালাতে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী কোনোভাবেই আর কাজে যেতে দেয়নি। তার ধারণা, এ ঘটনায় বাংলাদেশি ট্যাক্সি বা উবার চালকদের ওপর পুলিশ হয়তো বা চড়াও হয়ে আছে। অকারণে হয়রানি করতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালাতে মানা করছে আমার বউ। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে গাড়ির লিজ বা ভাড়া দেব কিভাবে, সেটাই ভাবছি।’

স্থানীয় সময় গত সোমবার সকালে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আকায়েদ ও তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই বিস্ফোণে জড়িত সন্দেহে পুলিশ আহত আকায়েদকে গ্রেপ্তার করেছে। আকায়েদ ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এ হামলা চালিয়ে থাকতে পারেন বলে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ধারণা।

সত্যিই জড়িত থাকলে আকায়েদের শাস্তি চায় বাংলাদেশিরা : বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহ যদি সত্যিই জড়িত থাকে তবে তার শাস্তি চায় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। নিউ ইয়র্ক পুলিশ দপ্তরে কর্মরত তিন

শতাধিক বাংলাদেশি কর্মকর্তার সংগঠন বাপা।

সোমবার ঘটনার পর জ্যাকসন হাইটসের একটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাপার কর্মকর্তারা বলেন, সঠিক তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে আকায়েদের শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ সন্ত্রাসীদের কোনো দেশ বা জাতি বলে কিছু নেই।

সংবাদ সম্মেলনে বাপার প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট শামসুল হক, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর, সাপ্তাহিক বাঙালির সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, সাউথ এশিয়ানদের মানবাধিকার সংগঠন ‘ড্রাম’-এর বাংলাদেশি সংগঠক কাজি ফৌজিয়া, বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি এলাকার সিটি কাউন্সিলর ডেভিড উইপ্রিন, বাংলাদেশি অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউ ইয়র্কের সভাপতি কামাল আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।



মন্তব্য