kalerkantho


মধ্যরাতে শেরপুর থানায় সাঁড়াশি হামলা চালাই

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মধ্যরাতে শেরপুর থানায় সাঁড়াশি হামলা চালাই

মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন

‘এক জীবনে আর কী চাই। মানুষ যে আমাকে গিয়াস কমান্ডার নামে চেনে, জানে—এতেই বড় তৃপ্তি। জীবনটাকে আমার কাছে খুব সার্থক মনে হয়।’ বলছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর কম্পানির কম্পানি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মো. গিয়াস উদ্দিন। শেরপুরের নকলা পৌর এলাকার বাজারদি মহল্লার নিজ বাসভবনে তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তুলে এনেছেন একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের সাহসী দিনগুলোকে।

যে কয়েকটি যুদ্ধ করেছি তার মধ্যে শেরপুর থানা আক্রমণ এবং সূর্য্যদী গণহত্যার প্রতিরোধ যুদ্ধের স্মৃতি এখনো রোমাঞ্চিত করে। বিভিন্ন রণাঙ্গনে লড়াইয়ে তখন আমরা অনেকটা ক্লান্ত। শেরপুর সদরের ফটিয়ামারি এলাকার চরাঞ্চলে তখন আমার কম্পানি নিয়ে অবস্থান করছিলাম। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, শেরপুরের বদর বাহিনীর কমান্ডার কামারুজ্জামান এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা দম্ভোক্তি করে প্রচারণা চালাচ্ছে শহরে মুক্তিবাহিনী একটি গুলিও ছুড়তে পারবে না। এর চ্যালেঞ্জ জানাতে শেরপুর শহরে হানাদার ও তাদের এই দোসরদের অবস্থানে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেই। নবীনগর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা দুলাল মিয়া নারী সেজে রিকশায় করে পুরো শহর ঘুরে এসে জানালেন কোথায় আক্রমণ চালালে সুবিধা হবে। সদর থানা, জিকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, নয়ানি বাজার, বয়রা পরানপুর কালভার্ট ও শেরি ব্রিজে তখন পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসরদের অবস্থান ছিল। ঠিক হয়, শেরপুর সদর থানায় আক্রমণ করা হবে।

অপারেশন শেরপুর থানা : ২৯ অক্টোবর। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর দমকা বাতাস বইছে। কম্পানির সবাইকে ডেকে বললাম এটাই মোক্ষম সময়। কে কে যাবে, দাঁড়াও। ২০ জন রাজি হলো। সন্ধ্যায় রওনা দেই। একটি দুই ইঞ্চি মর্টার, দুটি এলএজি, এসএমজি, ৯টি এসএলআর ও ছয়টি মার্ক ফোর রাইফেল এবং প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ নিলাম। ফটিয়ামারি চর থেকে ধানক্ষেতের আইল ধরে ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে মাড়িয়ে রাত ১টার দিকে শহরের নবীনগর এলাকায় পৌঁছাই। পৌর পার্কের পুকুরের দক্ষিণ পাশে ১২ জনকে পাঠাই এবং আমিসহ বাকি আটজন নবীনগর হৈল্ল্যা হাজীর দোকান চার রাস্তার মোড়ে অবস্থান নেই। সম্ভবত ঝড়-বৃষ্টির কারণে প্রতিপক্ষ আমাদের শহরে ঢোকা বুঝতে পারেনি। রাত দেড়টার দিকে পৌর পার্কের অবস্থান থেকে একযোগে মর্টার, এলএমজি ও রাইফেলের গুলি ছুড়ি। এসএমজির ব্রাশফায়ারের কারণে তারা পাল্টা গুলিও ছুড়তে পারছিল না। যখন পৌর পার্কের অবস্থান থেকে মর্টার ও এসএমজির গুলি ছোড়া হচ্ছিল তখন কাভারিং পজিশনে নবীনগর হাজীর দোকান মোড়ের বর্তমান শহীদ মিনারের অবস্থানে থাকা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ বারবার চিৎকার করে আমার নিকট গুলি ছোড়ার অনুমতি চাইল। কিন্তু দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ার পর তার রাইফেলের বোল্ট আটকে যায়। সে চিৎকার করে বলছিল, ‘স্যার, আমার গুলি আটকে গেছে, রাইফেল ঠিক করে দেন।’ আমি তাকে সেখানে শুয়ে পড়তে বললেও সে আমার কথা না শুনে রাইফেল হাতে নিয়ে দৌড়ে আমার দিকে আসতে থাকে। তখনই হঠাৎ একটি গুলি তার পাঁজরের বাঁ দিক দিয়ে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। রশিদ রাস্তাতেই পড়ে গেল। ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট যুদ্ধ হলো। আমি পার্কের অবস্থানে থাকা পার্টিকে আমাদের অবস্থানে যোগ দেওয়ার সংকেত দিতেই তারা গুলি বন্ধ করে আমাদের অবস্থানে চলে আসে। কিন্তু তখন আমাদের পার্টির মজিবরকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে রশিদও গুরুতর আহত। মজিবর ধরা পড়েছে অথবা শহীদ হয়েছে—এমন আশঙ্কায় রশিদকে নিয়ে আমরা দক্ষিণ দিক দিয়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে আসি। নবীনগরের এক নারী টর্চের আলোয় পথ দেখাতে সহায়তা করলেন। গ্রামের এক লোক রশিদকে বহনের জন্য বাঁশের খাটিয়া, কাঁথা-বালিশ ও রশি দিলেন। ভোরে আমরা খুনুয়া পৌঁছাই। নৌকায় আহত রশিদকে চরখারচর নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে নাওভাঙ্গার কুদ্দুস ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করালে রশিদ বেঁচে যায়। (সরকারি চাকরি করে অবসরে গিয়ে ২০০৫ সালে মারা যায় রশিদ)। পরদিন সকাল ৮টার দিকে মজিবরও আমাদের মাঝে ফিরে আসে।

সূর্য্যদী প্রতিরোধ যুদ্ধ : সদরের রৌহা এলাকায় আত্মগোপনে আছি। সঙ্গে ৭০ জনের মতো যোদ্ধা। কামারিয়া এলাকার ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। এ খবর হানাদারদের দেয় পাশের গ্রামের রাজাকার ইয়াদ আলী খাঁ ও জিয়ারত খাঁ। ২৪ নভেম্বর সকালে হানাদাররা তেঁতুলতলার দিক থেকে গুলি করতে করতে এগোতে থাকে। সূর্য্যদী গ্রামের বড়বাড়ী ও কিসসাবাড়ী তারা পুড়িয়ে দেয়। শতাধিক লোককে ব্রাশফায়ার করার জন্য সূর্য্যদী স্কুলের সামনে দাঁড় করায়। এ সময় এলাকায় অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধারাও হানাদারদের প্রতিরোধের জন্য গুলি ছোড়ে। দক্ষিণ দিক থেকে আমার কম্পানি, পূর্ব দিক থেকে মুন্সেফ কম্পানি আর আমিনুল কম্পানি গুলি ছুড়তে ছুড়তে অগ্রসর হই। প্রায় তিন ঘণ্টার সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে মুন্সেফ কম্পানির আফছার আলী শহীদ হন। এ ছাড়া আইজ উদ্দিনসহ ৩৮ জন নিরীহ গ্রামবাসীও সেদিন হানাদারদের হাতে শহীদ হয়েছিল।

প্রশিক্ষণ থেকে রণাঙ্গনে : বৃহত্তর ময়মনসিংহের ২৬০ জনের মতো একটি দল নালিতাবাড়ীর নাকগাঁও সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ের ঢালু এলাকায় গিয়ে ইয়ুথ ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। নকলার আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হক, মিজান এমপি, ময়মনসিংহের অধ্যক্ষ মতিউর রহমান (বর্তমানে ধর্মমন্ত্রী) ঢালু ইয়ুথ ক্যাম্পে আমাদের অভ্যর্থনা জানান। আমি, শেরপুরের হযরত আলী, প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ, আজিজ (বর্তমানে প্রয়াত), মোখলেছুর রহমান চেয়ারম্যানসহ অনেকেই বাছাইয়ে টেকেন। আমাদের মেঘালয়ের তোরা ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আমাদের উইংয়ের প্রশিক্ষণ কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন রানা। ভালো করায় আমাকে ‘কম্পানি কমান্ডার’ বানানো হয়। ফুলপুরের সার্জেন্ট হালিম এবং নালিতাবাড়ীর প্রিন্সিপাল আবু তাহেরও কম্পানি কমান্ডার হয়েছিলেন। শুরুতে আমার কম্পানির সদস্যসংখ্যা ৮৪ জন থাকলেও পরে বিভিন্ন সময়ে কম-বেশি হয়েছে। ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। শেরপুর শহর, নকলা, নালিতাবাড়ী, জামালপুরের নুরুন্দি, ময়মনসিংহের পিয়ারপুর এসব এলাকায় আক্রমণের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমরা চরাঞ্চলে ‘হাইড আউট’ (গোপন অবস্থান) থেকে ‘হিট অ্যান্ড রান’ (আঘাত করো, পালিয়ে যাও) পদ্ধতিতে হানাদার ও তাদের দোসরদের ক্যাম্প, অবস্থান, স্থাপনায় অপারেশন চালাতে থাকি। ১ ডিসেম্বর আমরা ফের তোরা ফিরে যাই, ফিরি মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের সময় পুরো কম্পানি নিয়ে। হালুয়াঘাট, ফুলপুর হয়ে ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করি। বিনা বাধায় ময়মনসিংহ শহর মুক্ত ঘোষণা করা হয়। ময়মনসিংহ বিডিআর ক্যাম্পে (বর্তমানে বিজিবি) যাওয়ার পর সেখান থেকে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল মাঠে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে অস্ত্র জমা দেই। মুক্তাঞ্চল হওয়ায় ১৬ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের অস্ত্র জমা নেওয়া হয়। দুই মাস সেখানে অবস্থানের পর বাড়ি চলে আসি।

একাত্তরের আগে-পরে : শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের আন্ধারিয়া নামাপাড়া গ্রামের ইদ্রিস আলী মুন্সী ও ফজর বানু দম্পতির ৯ ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন ছিলেন ষষ্ঠ। ১৯৭১ সালে বয়স ছিল ২৬ বছর। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে গিয়াস উদ্দিন বলেন, “১৯৬৩ সালে একবার পিয়ারপুর থেকে ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যাচ্ছিলাম। পাকিস্তানি সৈনিকরা ওই ট্রেনের বেঞ্চে শুয়ে যাচ্ছিল, আর আমরা বাঙালিরা দাঁড়িয়ে। তার পরও ওরা বলছিল, ‘হট যাও, হট যাও।’ সেই থেকে পাকিস্তানিদের সহ্য করতে পারতাম না।” তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর নকলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়া হলে তিনি তাতে নাম লেখান।

১৯৭২ সালে কনজ্যুমারস সাপ্লাইয়ার্স করপোরেশন ‘কসকর’ এ চাকরি পেয়েছিলেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করার পর। ১৯৮৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে আসেন। নকলায় ১৯৯১ সালে কচিকাঁচা বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নকলা-নালিতাবাড়ী সড়কের পাশে গড়েরগাঁও এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা উইভিং ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত স্থানে ১৯৯৩ সালে ‘মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি বিদ্যানিকেতন’ নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক, ১৯৯৯ সালে জেলার সবচেয়ে ভালো ফলাফলের জন্য সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে সেই স্কুল থেকে বিদায় নেওয়ার পর এখন কাটছে পুরো অবসর সময়। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জেনে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন এই বীর সেনানী। তিনি ক্ষোভ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, আর এই লোভে অনেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হতে চাইছে। বিষয়টি লজ্জার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও বিকৃতি ঘটছে।

 


মন্তব্য