kalerkantho


রাজাকারের সঙ্গে লড়ে নিঃস্ব হয়েও তিনি গর্বিত

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রাজাকারের সঙ্গে লড়ে নিঃস্ব হয়েও তিনি গর্বিত

শেখ ইলিয়াস

‘বিচ্ছু মুক্তিযোদ্ধা’ শেখ ইলিয়াস। কিশোর বয়সে লড়েছেন পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাঁকে পেয়ে বসেছিল ওই অপশক্তির দোসররা।

খান এ সবুরের বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষী হওয়ায় কুখ্যাত এ রাজাকারের অনুসারীরা শারীরিকভাবে তাঁকে হেনস্তা করেছে নানাভাবে; রাষ্ট্রের উদ্যোগেও তাঁকে আসামি করে একের পর এক মামলা করা হয়েছে। কোথাও খুনের মামলার আসামি, কোথাও ডাকাতি বা অপহরণ মামলার আসামি। একসময় দেখা গেল তিনি খুলনা, বাগেরহাট-সাতক্ষীরা-যশোরের বিভিন্ন থানার ১৬টি মামলার আসামি। আইনি খরচ জোগাতে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করেন। শহরের নিরালাসংলগ্ন এলাকার ১০ বিঘা জমিও বিক্রি করে দিতে হয়।

‘বিচ্ছু যোদ্ধা’ ইলিয়াস, বলা যায় আজ কোনো রকমে টিকে আছেন। স্বাধীনতার মাস সামনে রেখে সম্প্রতি কালের কণ্ঠ কথা বলে ত্যাগী এই বীরসেনানীর সঙ্গে। তিনি জানান, একটি মুদি দোকান দিয়েছিলেন। দুুটি ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে ব্যবসায়ের পুঁজিও খুইয়েছেন।

শেখ ইলিয়াস সাক্ষাৎকারে রণাঙ্গনের গল্প, স্বাধীনতার পর অপশক্তির সঙ্গে নতুন লড়াই—সবই তুলে এনেছেন স্মৃতি থেকে। তিনি বলেন, খুলনা শহরের পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকার একটি পাড়ায় অস্ত্রধারী ৪০ জন রাজাকার ছিল। এরই মধ্যে এক বাড়ির দুই ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। বড় শেখ জালালউদ্দিন এবং ছোট ইলিয়াস। এলাকাটি মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের অনুসারীদের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল তৎকালে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়ে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও সার্টিফিকেট হাতিয়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে। না, ইলিয়াস কোনো সার্টিফিকেট নেননি। বড় ভাই শেখ জালালউদ্দিনও সার্টিফিকেট নেননি, ছোটেননি কোনো সুবিধার পেছনে।

মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস বলেছেন, অনেক কিছু হারানোরও পরও তিনি গর্ববোধ করেন, কেউ যখন তাঁকে ‘বিচ্ছু মুক্তিযোদ্ধা’ বলে, সম্বোধন করে খান এ সবুরের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সাক্ষী হিসেবে। ইলিয়াস জানান, শুনানি চলাকালেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নারকীয়ভাবে একান্ত অনেক স্বজনসহ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু। পাল্টে যায় দৃশ্যপট। একদিকে মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়; অন্যদিকে শেখ ইলিয়াসের ওপর নেমে আসে আক্রমণের খড়্গ। আগে যারা আড়ালে গালি দিত, তারা প্রকাশ্যে বাজে কথা বলতে শুরু করে।

যুদ্ধে যাওয়ার স্মৃতিচারণা করে শেখ ইলিয়াস জানান, তখন সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের উত্তাপ আগেই গায়ে লেগেছিল। যুক্ত হয়েছিলেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে। বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন, সঙ্গে গেলেন ইলিয়াসও। অবশ্য বয়স কম হওয়ার অজুহাতে বড় ভাই ও অন্যরা শুরুর দিতে তাঁকে অস্ত্র হাতে নিতে দিতে চাইতেন না। ইলিয়াস থাকতেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই। মূলত তথ্য আদান-প্রদানের কাজ করতেন বলে রাজাকারদের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাঁরা নাম দেন ‘বিচ্ছু মুক্তিযোদ্ধা’। পরে ইলিয়াস অস্ত্র হাতেও লড়াই করেন। তিন-তিনটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।

সারা শহরে ছিল তাঁর বিচরণ। বয়সে কিশোর বলে থাকতেন সন্দেহের বাইরে। তাঁর প্রথম অপারেশনটি ছিল খুবই উত্তেজক। মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন, খুলনার অদূরে গল্লামারী রেডিও স্টেশনটি দখলে নেবেন। হবে। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের মুখে শেখ কামরুজ্জামান টুকুসহ আরো অনেকে তখন রূপসা নদীর ওপারে। ইলিয়াস ও আরো কয়েকজন কিশোর তখন খুলনা ও রূপসার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গল্লামারী যুদ্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। ৩ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ যুদ্ধে ইলিয়াসের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে পশ্চাদপসরণে সহযোগিতা করা। বানিয়াখামারের পশ্চিম অংশজুড়ে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ অবস্থান করে পাকিস্তান সেনাদের বাধা দিয়ে চলেছিল; সেই এলাকায় বসবাসকারী মানুষ হিসেবে ইলিয়াস প্রধান যোগাযোগকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। অবশ্য এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা সফল হতে পারেননি। তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

শেখ ইলিয়াস শুরুতে খুলনা শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে তথ্য আদান-প্রদান করতেন। রাজাকারদের নজরে পড়ে যাওয়ায় তাঁর জন্য শহর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তিনি চলে যান খুলনা জেলার উত্তরাংশ তেরখাদা উপজেলায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ফহমউদ্দিনের নেতৃত্বে স্থানীয় যুদ্ধে অংশ নেন। আর তেরখাদা, রূপসা, দিঘলিয়া প্রভৃতি এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষার কাজ করেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘বেঁচে থাকবারই কথা নয়, কিভাবে যে বেঁচে আছি, সেটাই বিস্ময়ের। ’

একদিন দেশ স্বাধীন হয়। রাজাকারদের পতন হয়। দালাল আইন হলো। রাজাকারদের নামে মামলা হলো। কুখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের নামেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত জোগাড় হলেও সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছিল না। কেউই সাক্ষী হতে চাইছিল না ভয়ে, কারণ তখনো তার প্রতি অনুগত লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। শেখ ইলিয়াস কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ আগ্রহ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে। আহ্বান জানায় সাক্ষী হওয়ার। কিশোর ইলিয়াস এগিয়ে আসেন, সাক্ষী হন। ওই মামলায় আরো সাক্ষী ছিলেন পাঁচজন। তাঁরা সবাই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মী। খান এ সবুরের বিরুদ্ধে দায়ের মামলাটির শুনানি ১৯৭৪ সালে শুরু হয়। খুলনা থেকে ইলিয়াসরা মামলায় সাক্ষ্য দিতে ঢাকা যান। ইলিয়াস জানান, তাঁর সাক্ষী হওয়ার ঘটনাটি খান এ সবুর ভালোভাবে নেননি। সবুর বলেছেন, ছেলেটি এত বড় সাহস পায় কোত্থেকে! একদিন আদালতের বারান্দায় ইলিয়াসকে ডেকে খান এ সবুর ধমকও দিয়েছিলেন। ইলিয়াস স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সবুর আমাকে সেদিন বলেছিল, ‘এই বিচ্ছু, তুই ইলিয়াস। তুই জানিস, আমি কে? আমার কিচ্ছু হবে না। দেখিস না, আমি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি, আর তুই কি না আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সাক্ষী হোস। তোর এত বুকের পাটা। ’

রাজাকার খান এ সবুরের এই আস্ফাালন ইলিয়াস আজও ভোলেননি। তবে তিনি ছেড়েও দেননি। ইলিয়াস বলেন, ‘সেদিন তার মুখের ওপর বলেছিলাম, তুমি যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার শিরোমণি। তোমার সাজা চাই, এ কারণে এই মামলায় আমি সাক্ষী হয়েছি। ’ ইলিয়াস আরো বলেন, ‘দশাসই চেহারার খান এ সবুর বেশ আকর্ষণীয় ছিল। চোখ দুটি বড় বড়। জবা ফুলের মতো লাল। খানিকটা ঝুঁকে আমাকে শাসায়। সেদিন তার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। একজন যুদ্ধাপরাধী বলে কি না, তার কিছু হবে না; পরে তো তা-ই হলো। সেদিনই খানিকটা আন্দাজ করেছিলাম, পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে গেলে কী ভয়ংকর হতে পারে; তবে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত আমি হব, তা তখনো বুঝিনি। ’


মন্তব্য