kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

এখনো ইশতেহার দেননি কোনো মেয়র প্রার্থী

মেয়র-কাউন্সিলরদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা চান ঝন্টু

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এখনো ইশতেহার দেননি কোনো মেয়র প্রার্থী

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তিন প্রার্থীই এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এর সঙ্গে যোগ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বলেছেন, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে হলে সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলরদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োজন।

কিন্তু মেয়র প্রার্থীদের কেউ এখনো তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সেসবের ব্যাখ্যা দিয়ে কোনো ইশতেহার ঘোষণা করেননি। বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ইশতেহার ঘোষণা করা জরুরি। কারণ এতে মানুষ তাঁদের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পায়।

গতকাল বুধবার দুপুরে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেওয়া তিন মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে সংলাপ করেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) নামের একটি সংগঠন। ‘নাগরিক অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান হয়েছে নগরের একটি কনভেনশন সেন্টারে। এই নাগরিক সংলাপে অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু, বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা।

শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু বলেছেন, এ নির্বাচনে যিনিই মেয়র হন—প্রথমেই নির্বাচিত মেয়রকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। তাহলে নবনির্বাচিত মেয়র নাগরিকদের অধিকার সহজেই নিশ্চিত করতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, এবার তিনি মেয়র হলে প্রধান সড়কের যানজট কমাতে নগরের তাজহাট থেকে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর উড়াল সড়ক নির্মাণ করবেন।

সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না—সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে যত নির্বাচন হয়েছে তা সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি। সে কারণে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আমার শঙ্কা আছে। সেই শঙ্কা দূর করতে হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে হলে আগে  নাগরিকদের সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই অপরিচ্ছন্নতা থেকে নগরকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। ’

বাবলা বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে শ্যামাসুন্দরী খাল দখলমুক্ত করে সংস্কার ও মশা নিধনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন।

মেয়র যিনিই হন তাঁকে পাশে থেকে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা।

লাঙ্গল প্রতীকের এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘নানা সমস্যায় জর্জরিত নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন। আমি নির্বাচিত হলে উত্তরণের পথ খুঁজতে নাগরিকদের মতামতকে প্রাধান্য দেব। সেই সঙ্গে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে কাজ করা হবে। ’

সংলাপ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি কেটি ক্রোক, উপপরিচালক (কার্যক্রম) আমিনুল এহসান প্রমুখ। সংলাপে রংপুরের সুধীসমাজের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ইশতেহার ছাড়াই নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীরা : রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

গত সোমবার প্রতীক পাওয়ার পর প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। এখন শুধু বাকি ভোটগ্রহণ। আগামী ২১ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হবে।

দলীয় প্রতীকে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন মেয়র পদে সাতজন, ১১টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন এবং ৩৩টি সাধারণ কাউন্সিলর পদের বিপরীতে ২১১ জন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত মেয়র প্রার্থীদের কেউ সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেননি। গণসংযোগের সময় আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী গড়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।

ইশতেহার ঘোষণা না করেই প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন মহল। গত ৫ নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই স্বল্প পরিসরে গণসংযোগ শুরু করেন প্রার্থীরা। তখন থেকেই তাঁরা শুধু আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। কিন্তু এর কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রার্থীদের অবশ্যই তাঁদের প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নে প্রার্থীদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া দরকার। ’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘এখনো কোনো প্রার্থী ইশতেহার ঘোষণা করেননি। বিশেষ করে দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এটা তো জরুরি। হয়তো সামনে তাঁরা সেটা করবেন। তবে রংপুর যেহেতু পিছিয়ে পড়া জনপদ, সে জন্য অবশ্যই নির্বাচনী ইশতেহারে নগরের উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট করতে হবে। ’

জানতে চাইলে নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণায় অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে তিনি ইশতেহার ঘোষণা করেননি। এ নির্বাচনেও ইশতেহার ঘোষণা করবেন না।

গত নির্বাচনে জয়লাভ করে অনেক উন্নয়ন করেছেন উল্লেখ করে ঝন্টু বলেন, জনগণ ইশতেহার ছাড়াই তাঁকে বিজয়ী করবে। তবে নির্বাচনে জয়লাভ করলে বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নে বিশেষ নজর রাখবেন বলে জানান তিনি।

জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ইশতেহার প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন।

ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা বলেন, ‘এখনো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করিনি। তবে দ্রুতই ইশতেহার ঘোষণা করব। ’ তাঁর ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত ও পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা এবং সিটি করপোরেশনের বর্ধিত অনুন্নত ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নের প্রাধান্য থাকবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, তিনিও অল্প সময়ের মধ্যে ইশতেহার ঘোষণা করবেন। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে সব নাগরিকের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত, দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন গঠন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ থাকবে। নির্বাচনে জয়ী হলে প্রাতশ্রুতি অনুযায়ী নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘রংপুর সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যিনি নগর পিতার আসনে আসীন হবেন তাঁকে অবশ্যই মনের দিক থেকে তরুণ, উন্নয়নকামী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দূরগামী হতে হবে; যিনি পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে নগরীকে আধুনিক ও বসবাসযোগ্য করে তুলবেন। ’ নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে ড. নাজমুল বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে অবশ্যই উন্নয়নের রূপরেখা বিদ্যমান থাকবে। পিছিয়ে থাকা এ নগরীর উন্নয়নে শিক্ষা, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ’


মন্তব্য