kalerkantho


আ. লীগে শিখর-ওয়াহ্হাব বিএনপিতে মুরাদসহ ৬

শামীম খান, মাগুরা   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগে শিখর-ওয়াহ্হাব বিএনপিতে মুরাদসহ ৬

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাগুরা-১ আসনের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রে লবিং চালানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলের নেতারাও নির্বাচন সামনে রেখে তৎপর রয়েছেন।

মাগুরা সদরের ১৩টি ইউনিয়ন ও শ্রীপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাগুরা-১ আসন। এটি জাতীয় সংসদের ৯১ নম্বর নির্বাচনী এলাকা।

১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘ দুই দশকের অধিক সময় আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। পর পর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সিরাজুল আকবর। ২০১৫ সালের ৯ মার্চ তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য হন দলের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আব্দুল ওয়াহ্হাব। উপনির্বাচনের আগে জেলার রাজনীতিতে তাঁর কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।

আওয়ামী লীগ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াহ্হাব ঢাকা থেকে মাঝেমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় এসে দুই-একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের কর্মসূচিগুলোতে তাঁর তেমন উপস্থিতি চোখে পড়ছে না।

জেলা আওয়ামী লীগ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আছে—এমন অভিযোগ অনেকেরই। এটা তাঁর আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অনেকেই মনে করছে।

তবে আব্দুল ওয়াহ্হাব কালের কণ্ঠকে বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এলাকার উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। যোগাযোগ রক্ষা করছেন অনেকের সঙ্গেই। আগামী নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানান।



এ আসনে এখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত সংসদ সদস্য আছাদুজ্জামানের ছেলে সাইফুজ্জামান শিখর। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাইফুজ্জামান শিখর নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন কর্মসূচি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে ঢাকা থেকে মাগুরায় আসছেন। দল-মত-নির্বিশেষে সব মানুষের আস্থার নেতা আছাদুজ্জামানের ছেলে হিসেবে জেলার রাজনীতিতে সাইফুজ্জামান শিখরের একটি অবস্থান রয়েছে। পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশে ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছেন তিনি। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে এসব কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন।

শিখরের মনোনয়ন প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তানজেল হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এখনো পর্যন্ত সাইফুজ্জামান শিখরকেই মাগুরা-১ আসনের যোগ্য প্রার্থী মনে করছি। তাঁর বাবা আছাদুজ্জামান ছিলেন আমার রাজনীতির দীক্ষাগুরু। দেশ ও জেলার মানুষের জন্য তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। সাইফুজ্জামান শিখরের মধ্যে সেই আত্মত্যাগ ও কর্মীবান্ধব মানসিকতা খুব স্পষ্ট। দলের ভেতরে-বাইরে তাঁর একটি গ্রহণযোগ্যতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যেটি নির্বাচনে প্রধানতম শক্তি হিসেবে কাজ করে। এ কারণে আমি তাঁকে মাগুরা-১ আসনে প্রার্থী হিসেবে পেতে চাই। ’

এরই মধ্যে সাইফুজ্জামান শিখর ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন জানিয়ে তানজেল হোসেন আরো বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। এসব কারণে তাঁকে নিয়ে সর্বস্তরে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

মাগুরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান সালাউদ্দিনসহ অনেকের দাবি, সাইফুজ্জামান শিখর মাগুরা-১ আসনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক সহযোগিতা পাচ্ছেন। পাশাপাশি যেকোনো সমস্যায় তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তাঁর সহযোগিতা পাচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর একটি নিবিড় সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে, যেটি অতীতে তাঁর বাবা আছাদুজ্জামানের ক্ষেত্রে হয়েছিল। জনবান্ধব মানুষ হিসেবে আছাদুজ্জামানকে আমৃত্যু মাগুরার মানুষ যেভাবে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন, সাইফুজ্জামান শিখর মাগুরার সংসদ সদস্য প্রার্থী হলে একই কারণে মানুষ তাঁকে গ্রহণ করবে।

তাঁরা আরো বলেন, উন্নয়নের প্রশ্নে জনপ্রতিনিধি না হয়েও মাগুরায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন শিখর। মাগুরার রেললাইন, মাগুরার অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম, ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, বন্ধ হয়ে যাওয়া টেক্সটাইল মিল চালু, নবগঙ্গা ব্রিজ, মহম্মদপুরের মধুমতী নদীর ওপর নির্মিত শেখ হাসিনা সেতুসহ জেলার অন্তত অর্ধশত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে তাঁর অবদান রয়েছে। এ ছাড়া জেলার খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় দল-মত-নির্বিশেষে সাইফুজ্জামান শিখরের প্রতি মানুষের ব্যাপক আস্থা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে তাঁকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পেতে চায় দলীয় নেতাকর্মীরা।

মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হলে জেলার উন্নয়ন আরো বেগবান হবে উল্লেখ করে সাইফুজ্জামান শিখর বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা মেনে এমপি নির্বাচনের লক্ষ্যে আমি অনেক আগে থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক একান্ত সহকারী হিসেবে কাজ করছি। জেলাবাসী চাইলে নির্বাচিত হয়ে আমার বাবার মতো দেশ ও মানুষের জন্য সব ধরনের আত্মত্যাগে আমি প্রস্তুত। সে লক্ষ্যেই ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমি সব সময় মাগুরার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছি। সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে আমি আজীবন মানুষের পাশে থাকতে চাই। ’

বিএনপি : কোন্দলে জড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত বিএনপির অন্তত ছয়জন নেতা এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কবীর মুরাদ, দলের জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মোকাদ্দেস হোসেন, আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান হাবিব কিশোর, মাগুরা পৌরসভার সাবেক মেয়র নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী ইকবাল আকতার খান কাফুর, শ্রীপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও শ্রীপুর উপজেলা শাখার একাংশের সভাপতি বদরুল আলম হিরো ও জেলা কমিটির সাবেক সহসভাপতি বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মনোয়ার হোসেন খান। তাঁদের মধ্যে মনোয়ার হোসেন খান মাগুরার আলোচিত পেট্রলবোমা হামলা মামলার আসামি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা ও জিয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা কবীর মুরাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত নিবিড়ভাবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি। দলের চরম দুঃসময়ে আমি আট বছর মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমি সব সময় খালেদা জিয়া ও জেলার মানুষের পাশে আছি। সব ধরনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে দল ও সর্বস্তরের মানুষের পাশে অতীতে যেমন ছিলাম, এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। আমি বরাবরই সংগ্রামী ও অহিংস মানুষ। আন্দোলন করতে গিয়ে নানা অত্যাচার-নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হয়ে বাকি জীবনটা মানুষের জন্য উৎসর্গ করতে চাই। ’

বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আহসান হাবিব কিশোর বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছি। যুবদলের পর জেলা বিএনপির সর্বশেষ কমিটির সহসভাপতি ছিলাম। বর্তমানে মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছি। আমার বাবা মাগুরা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ কারণে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক নিবিড়। মাগুরায় বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আমি চেষ্টা চালাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে বিএনপির মূলধারার পরীক্ষিত নেতাদের মনোনয়ন দিলে আমি অগ্রাধিকার পাব এবং বিজয়ী হবো—এমনটি আশা করি। ’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইকবাল আকতার খান কাফুর বলেন, ‘আমি মাগুরা পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়রপ্রার্থী হিসেবে দুবার বিজয়ী হয়েছি। একাধিকবার এমপি নির্বাচন করেছি। সর্বশেষ ২০০৮ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছিলাম। আমাকে মনোনয়ন দিলে এবার দলীয় প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করব বলে আশাবাদী। ’

জাতীয় পার্টি : জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা হাসান সিরাজ সুজা বলেন, ‘পার্টি চেয়ারম্যান ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। যে কারণে আগামী নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনের প্রার্থী হিসেবে আমি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। ’

জাসদ : জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মাগুরা জেলা কমিটির সভাপতি এ টি এম মহব্বত আলী প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন।


মন্তব্য