kalerkantho


নিরাপত্তা চাওয়া ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা

রাজশাহীর আইএইচটি বন্ধ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিরাপত্তা চাওয়া ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা

ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের উৎপাত বন্ধ এবং নিরাপত্তার দাবিতে রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর গতকাল ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা চালায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

গণধর্ষণের হুমকির বিচার ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে ফেরার পথে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছে রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) ছাত্রীরা। গতকাল বুধবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে এই হামলায় আহত হয়েছে কমপক্ষে আটজন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জানা গেছে, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিনের নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়। হামলায় আহতরা হলেন প্রথম বর্ষের ছাত্রী মোহনা খাতুন ও রূপা খাতুন, ফার্মেসি বিভাগের জ্যোতি খাতুন, একই বিভাগের প্রথম বর্ষের নাবীলা খাতুন এবং তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মীম ও জুঁই। তাঁদের মধ্যে নাবিলা, রূপা ও মোহনাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর আইএইচটি কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের ক্লাস, পরীক্ষাসহ হোস্টেল বন্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দুপুর ১টার মধ্যে ছাত্রদের এবং বিকেল ৩টার মধ্যে ছাত্রীদের হোস্টেল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুপুরে রাজশাহী আইএইচটির একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর ঝাউতলা মোড় এলাকায় আইএইচটির ভেতরেই মেয়েদের হোস্টেল। সেখানে ৫৫ জন ছাত্রী থাকে বলে জানা গেছে।

হঠাৎ করে হোস্টেল বন্ধ ঘোষণার পর দুর্ভোগে পড়ে তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকালে আইএইচটির অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোস্টেলের সব ছাত্রী ও তাদের সহপাঠী কয়েকজন ছাত্র মিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে যায় অধ্যক্ষের কাছে। সেখানে তারা ধর্ষণের হুমকি প্রদানকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের শাস্তি, ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হোস্টেলের সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে ফেরার পথে ছাত্রীদের পেছন থেকে ধাওয়া করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিনকে সামনে থেকে ছাত্রীদের ধাওয়া করতে দেখা যায়। তিনি কয়েকজন ছাত্রীর পরনের কাপড় ধরে হাত দিয়ে পেটাতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় ছাত্রলীগের আরো অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী। তারাও ছাত্রীদের ধরে ধরে পেটাতে থাকে। আইএইচটি ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ হাসান জাহিদও এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।  

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের এই হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন ছাত্রী আহত হন। হোস্টেলের প্রধান ফটকের সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এমন ঘটনা ঘটালেও উপস্থিত পুলিশ ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। পরে পুলিশ এগিয়ে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করতেও দেখা যায়। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মারধরের শিকার শিক্ষার্থীরা জানায়, গণধর্ষণের হুমকির প্রতিবাদে গতকাল সকালে ছাত্রীরা আন্দোলন শুরু করলে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন, কর্মী সাইদ হাসান, মাহমুদ হাসান, জাকির হোসেন, কাইউম, নাহিদসহ বহিরাগত আরো কয়েকজন মিলে তাদের উদ্দেশ করে গালাগাল করতে থাকে। এ সময় উভয় পক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই ক্যাম্পাসে পুলিশ উপস্থিত ছিল। কিন্তু ছাত্রীদের মারধরের সময় পুলিশ তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি। পুলিশের উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধাওয়া দিয়ে ছাত্রীদের পিটিয়ে আহত করে। সাধারণ কয়েকজন ছাত্র এ সময় ছাত্রীদের উদ্ধার করতে গেলে তাদেরও পেটানো হয়।

আহত নাবিলা, রূপাসহ অন্যরা জানান, ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বরিশালে আইএইচটির শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে ওই দিনটিকে কালো দিবস পালন করে আসছেন তাঁরা। এরই অংশ হিসেবে গত ৩ ডিসেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করে রাজশাহী আইএইচটির শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগ চাচ্ছিল ক্যাম্পাসের ভেতরেই কর্মসূচি পালন করা হোক। আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালন করতে চায় ক্যাম্পাসের বাইরে। এর জের ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। এমনকি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ায় ছাত্রীদের নেতৃত্বদানকারী দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে হোস্টেলে ঢুকে প্রকাশ্যে গণর্ধষণের হুমকি দেয় তারা। অন্য ছাত্রীদেরও এমন হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া হোস্টেলের বাইরে অবস্থান নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রীদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করতে থাকে।

ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, গত ৩ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় সংগঠনটির নেতারা ছাত্রীদের ডেকে পাঠান। কিন্তু যে ছাত্রীরা তাঁদের সঙ্গে দেখা করেনি তাদের হোস্টেলে ঢুকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। সেই বৈঠকে ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। এই ঘটনার বিচার চাইতেই গতকাল অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রীরা। শেষে অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ফেরার পথে তাদের ওপর পেছন থেকে হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

হামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ রাজশাহী আইএইচটি শাখার সভাপতি জাহিদ হাসান জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছাত্রলীগ চাইছিল গত ৩ ডিসেম্বর মানববন্ধন কর্মসূচি আইএইচটির ভেতরেই করা হোক। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রীরা নগরীর জিরো পয়েন্টে ওই কর্মসূচি করতে চায়। এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ছাত্রীরাই আগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে গালাগাল করে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কোনো ছাত্রীকে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। ’

সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন বলেন, ‘আতঙ্কে দৌড় দিতে গিয়ে হোস্টেলের প্রধান ফটকের সামনে ধাক্কা খেয়ে কয়েকজন ছাত্রী সামান্য আহত হয়েছে। আমরা কেউ তাদের মারধর করিনি। ’

আইএইচটির অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি কয়েকজন ছাত্রীকে পেটানো হয়েছে। তাদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পেয়েছি। এসব বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হবে। এরপর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার আমির জাফর বলেন, ‘পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে হামলার অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের ছাত্রত্ব নেই। ২০১২ সালে গঠিত কমিটির মেয়াদও ২০১৩ সালেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো অছাত্র এই দুই নেতা আইএইচটিতে রাজত্ব করে চলেছেন। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ে তাঁদের চলাচল বলেও অভিযোগ উঠেছে।


মন্তব্য