kalerkantho


মনোনয়নপ্রার্থীর তালিকা দীর্ঘ বড় দুই দলেই

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মনোনয়নপ্রার্থীর তালিকা দীর্ঘ বড় দুই দলেই

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চুয়াডাঙ্গা-১ (তিতুদহ ও বেগমপুর ইউনিয়ন বাদে সদর উপজেলা এবং আলমডাঙ্গা উপজেলা) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। চলছে গণসংযোগ।

ব্যানার-ফেস্টুন টানিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ তোরণও নির্মাণ করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতেও দেখা যাচ্ছে তাঁদের।

জাতীয় সংসদের ৭৯ নম্বর আসনটি একসময় বিএনপির দখলে থাকলেও এখন তা আওয়ামী লীগের কবজায়। এ নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির অবস্থান ছিল খুবই শক্তিশালী। জামায়াত যোগ হয়ে বিএনপির শক্তি আরো বেড়ে যায়। এ কারণে আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আসনটি ধরে রাখতে আশাবাদী।

বড় দুই দলেই সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা বেশ দীর্ঘ।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২৬ হাজার ৯৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ১২ হাজার ৮৪০ জন এবং নারী দুই লাখ ১৪ হাজার ১৫১ জন।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার বাদল রশিদ। এরপর দীর্ঘ বিরতি। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন জয়লাভ করেন। মাঝখানের সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেশির ভাগেই বিএনপির প্রার্থী জিতেছেন। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। সোলায়মান হক আবার সংসদ সদস্য হন।

আওয়ামী লীগ : ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আসাদুল হক বিশ্বাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্যের সহোদর সাবেক পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী এবং এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।

সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন আগের পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়নের শক্ত দাবিদার। আগে দলে তীব্র কোন্দল ছিল না। সে অবস্থা এখন আর নেই। তীব্র কোন্দলে জেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সংগত কারণেই দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার নেতাও বেড়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, মনোনয়নের হিসাব সরিয়ে রেখে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনকে নিয়ে আলোচনা করলে যে কেউ স্বীকার করবে, তিনি আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। রাজনীতির বাইরে সারা জীবনে অন্য কোনো কিছু তিনি করেননি। এ জন্য আওয়ামী লীগের মতো বড় দল হওয়ার পরও পুরো নেতৃত্ব তাঁর হাতেই থেকেছে বছরের পর বছর। এখনো তিনি জেলায় দলের কাণ্ডারি হয়ে আছেন।

সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন বলেন, ‘অতীতে আমি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছি। এবারও পাব বলে আশাবাদী। ’

তবে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সামসুল আবেদীন খোকনের অনুসারীরা বলছে, এ আসনের মনোনয়ন এবার হাতবদল হোক। তারা চায়, শেখ সামসুল আবেদীনকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। তিনি নিজেও মনোনয়ন লাভের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

শেখ সামসুল আবেদীন বলেন, ‘আমি দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে চুয়াডাঙ্গা ঘিরে আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। আমি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, মাদক নির্মূল, আর্সেনিক সমস্যার নিরসন এবং শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। বাল্যবিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনোভাবেই তা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এসব নিয়ে কাজ করব আমি। ’

জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী পেশাগত কারণে ঢাকায় থাকলেও প্রায়ই আসেন চুয়াডাঙ্গায়। চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে।

ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী বলেন, ‘দলীয় হাইকমান্ডের কাছে আমি মনোনয়ন চাইব। দল ও মানুষের জন্য অতীতে যা করেছি, সেদিক বিবেচনায় দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। ’

জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আসাদুল হক বিশ্বাস হঠাৎ করেই মাঠে নেমেছেন। গণসংযোগ শুরু করেছেন। বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুনও শোভা পাচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন দীর্ঘদিন ধরে মাঠে তৎপর। প্রতিনিয়ত তিনি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এভাবে তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের সঙ্গে নিজের যোগাযোগ ধরে রেখেছেন। তিনি দলীয় হাইকমান্ডের কাছে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন।

বর্তমান মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করেছেন। জীবনে প্রথমবার চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র পদের মতো বড় নির্বাচনে দাঁড়িয়ে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। বিজয়ী হওয়ার পর থেকে পৌর এলাকার উন্নয়ন ও পৌরবাসীর বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে কাজ করছেন।

ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু বলেন, ‘আমি দলীয় মনোনয়নের জন্য আবেদন করব। দল ও এলাকার মানুষের জন্য আমি আমাকে উৎসর্গ করেছি, তা আপনারা জানেন। আমি মনে করি, মনোনয়ন পাব। ’

এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী।

বিএনপি : বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, জেলা আহ্বায়ক কমিটির নির্বাহী সদস্য শরীফুজ্জামান শরীফ, মন্ত্রিপরিষদের সাবেক যুগ্ম সচিব ড. মো. আব্দুস সবুর (এম এ সবুর) ও আলমডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র মীর মহিউদ্দিন।  

দলটির অনেক নেতাকর্মী জানায়, এ আসন ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। মানুষ ভেতরে ভেতরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সেই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর বিএনপিতে কোন্দল থাকলেও তা নির্বাচনে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু ১৯৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিজয়ী হন। একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদেও তিনি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। দলীয় মনোনয়ন পান সেই সময়ের জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম। ওই নির্বাচনেও বিএনপি জয়লাভ করে।

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে দল নির্বাচনে যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এর পরও আমাদের দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি আছে। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে একমাত্র আমিই জীবিত আছি। আমি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করি এবং বিশ্বাস করি যে পাব। ’

দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার তালিকায় থাকা জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, ‘দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আস্থাশীল। ম্যাডাম কাউকে মনোনয়ন দিলে আমিই পাব বলে বিশ্বাস করি। ’

শামসুজ্জামান দুদু ও অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ছাড়া আরো যাঁরা বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী, তাঁদের মধ্যে শরীফুজ্জামান শরীফ বেশ আগে থেকেই সরব রয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে এলাকার সাধারণ ভোটাররা তাঁর পাশে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘১০ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির সাংগঠনিক কাজ নেই। আগে চুয়াডাঙ্গাকে বলা হয়েছে ধানের শীষের জেলা। এখন ধানের শীষ প্রতীক হলেই যে প্রার্থী জিতবেন তেমন গ্যারান্টি নেই। যাঁরা নেতৃত্বে ছিলেন তাঁরা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে রাখতে পারেননি। এখন সাংগঠনিক কাজ দরকার। নেতাকর্মীদের এক করা দরকার। আমি মনে করি, এ কাজে মাঠ জরিপে আমি এগিয়ে। আমি মনোনয়ন পাব বলে আশাবাদী। এর পরও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেব। ’

ড. মো. আব্দুস সবুর (এম এ সবুর) রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে থেকেই তিনি গণসংযোগ শুরু করেন। দলীয় কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন। প্রচারপত্র বিতরণ করছেন। এখন থেকেই তিনি ভোটারদের ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ড. সবুর বলেন, ‘মাঠে কাজ করার জন্য আমাকে বলা হয়েছে। আমি দলীয় নির্দেশে মাঠে নেমেছি। মনোনয়ন পাব বলে বিশ্বাস করি। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেলে নির্বাচন করব না। ’

এদিকে জামায়াতও অধ্যাপক আব্দুল খালেককে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তবে জোটগত নির্বাচন হলে খালেক মনোনয়ন পাবেন কি না, সেটা নিশ্চিত নয়।

জাতীয় পার্টি : সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হন সাইফুল ইসলাম পিনু। কিন্তু তিনি নির্বাচনে খুব বেশি ভালো করতে পারেননি। ১৯৯৯ সালে সোহরাব হোসেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর দলটি বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তিনি ২০০৩ সাল পর্যন্ত দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সোহরাব হোসেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘দলের হাইকমান্ড থেকে আমাকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। আমি এর আগেও মনোনয়ন পেয়েছি। এবারও পাব বলে প্রত্যাশা করি। অতীতের চেয়ে এখানে অনেক ভালো অবস্থানে আছে জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে বড় দুই দলেই আছে কোন্দল, যার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। ’


মন্তব্য