kalerkantho


মনোনয়ন ‘পোক্ত’ ইনুর বিএনপিতে একাধিক

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মনোনয়ন ‘পোক্ত’ ইনুর বিএনপিতে একাধিক

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল বলেই বর্ণনা করে এলাকার মানুষ। এর জন্য অতীতের ঘটনাবলি টেনে আনে তারা।

বেশ কয়েকবার বিএনপি প্রার্থী এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে এ এলাকার সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী। এ কারণে আগামী নির্বাচনে এ আসনের দিকে চোখ থাকবে সবার।

মাঠপর্যায়ে ঘুরে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ জোট থেকে হাসানুল হক ইনুর মনোনয়ন এক রকম পাকাপোক্ত। তাঁর দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) স্থানীয় নেতারা বলছেন, এখানে ইনুর বিকল্প আর কোনো প্রার্থী নেই।

ওই আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা কথা বলতে রাজি হননি। তাঁরা বলছেন, প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই ঠিক করবে।

অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির মনোনয়ন আলোচনায় একাধিক নেতার নাম শোনা যাচ্ছে।

মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৭৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটি একসময় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ছিল। নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের সরব পদচারণের কারণে সাধারণ মানুষ সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকত। নির্বাচনকালে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হতে দেখা গেছে। নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজনকে ভোটকেন্দ্রে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে।

এ আসনে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হলো যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে তার বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। এই প্রথমবারের মতো এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভালো সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। তবে জাসদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিরোধ আছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে ইনুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। তারা ইনুর মনোনয়ন বাতিল করে এ আসনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল।

মহাজোট গঠনের আগে এ আসনে জাসদ দলীয় প্রার্থী হিসেবে হাসানুল হক ইনু ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাহবুবউল আলম হানিফও ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তিনি কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

কুষ্টিয়া-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত দুই উপজেলার মধ্যে মিরপুর উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি  পৌরসভা এবং ভেড়ামারা উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ২৮ হাজার ২১৬ জন। এর মধ্যে মিরপুর উপজেলায় দুই লাখ পাঁচ হাজার ৭৭৭ জন এবং ভেড়ামারা উপজেলায় এক লাখ ২২ হাজার ৪৩৯ জন।

আওয়ামী লীগ জোট : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু মনোনয়ন পাওয়ার শক্ত দাবিদার। আওয়ামী লীগ জোটগতভাবে আগামী নির্বাচনে অংশ নিলে তিনিই মনোনয়ন পাবেন—এ ব্যাপারে এক রকম নিশ্চিত জাসদের নেতাকর্মীরা। তার পরও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হাসানুল হক ইনুর গণসংযোগ অব্যাহত রয়েছে।

জাসদের নেতাকর্মীরা জানায়, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ জোট আরো শক্তিশালী হচ্ছে। অতএব ইনুর বাদ পড়ার কোনো কারণ নেই। তিনিই জোটের একমাত্র প্রার্থী।

জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মোহসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৮ সালে মহাজোটের রূপকারকে বাদ দিয়ে তো আর জোট হয় না। তাই তিনি আছেন এবং থাকবেন। সেখানে হাসানুল হক ইনুর বিকল্প কাউকে ভাবা হচ্ছে না।

বিএনপি : এ আসনে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে একাধিক ব্যক্তি নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম। তিনি আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন এ রকম লক্ষ্য নিয়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে শহিদুল ইসলাম এ আসন থেকে বিএনপিদলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দলটির অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরীও এলাকায় গণসংযোগ করছেন। মিরপুর-ভেড়ামারা নির্বাচনী এলাকার মিরপুর উপজেলার বাসিন্দা তিনি। মিরপুর উপজেলায় ভোটারের সংখ্যা ভেড়ামারার তুলনায় দ্বিগুণ। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাঁর বাবা প্রয়াত আব্দুর রউফ চৌধুরী তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবার রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি রাগিব রউফ চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক।

ব্যারিস্টার রাগিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ চাচ্ছেন আমি নির্বাচন করি। সে কারণে আগেও মাঠে ছিলাম এবং এখনো আছি। ’

অন্যান্য : এখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত দলটির নেতা আব্দুল গফুরকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে একই জোটের আরেক শরিক দল জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) কেন্দ্রীয় নেতা আহসান হাবিব লিংকনও এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জনসংযোগ করছেন। এরশাদের শাসনামলে লিংকন ছিলেন এ আসনের সংসদ সদস্য। তিনি কুষ্টিয়া জেলা পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। এলাকায় তিনিও বেশ জনপ্রিয় নেতা। তবে বিএনপির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে গেলে এখান কোন দল থেকে প্রার্থী দেওয়া হবে সেটা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আহসান হাবিব লিংকন বলেন, ‘রাজনীতি যখন করি তখন নির্বাচন তো করবই। এ জন্য কাজ করছি। ’


মন্তব্য