kalerkantho


লিট ফেস্ট

বিশ্বসাহিত্যের মিলনমেলা

নওশাদ জামিল   

১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বসাহিত্যের মিলনমেলা

কবি অ্যাডোনিস গতকাল লিট ফেস্টের উদ্বোধনী মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’ উদ্বোধন করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজছে বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বর।

কিন্তু তা বাধা হতে পারেনি আনন্দযজ্ঞে। সকালে একাডেমি প্রাঙ্গণে পৌঁছতেই দেখা গেল একাডেমির সবুজ আঙিনা, পুকুরপাড়, ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউস—সর্বত্র বৃষ্টিভেজা আনন্দের উৎসব। গোটা চত্বরে ঘুরছেন দেশ-বিদেশের লেখকরা। অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন অধিবেশনে। তাতে লেখক-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির নানা শাখার মানুষের সরব উপস্থিতি।

দেশ-বিদেশের যশস্বী কবি-সাহিত্যিক, অনুবাদক, নাট্যকারদের নিয়ে আয়োজিত এ উৎসবের নাম ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো তিন দিনব্যাপী এ উৎসব। আর আসরের মধ্যমণি হয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেছেন প্রধান অতিথি সিরিয়ান বংশোদ্ভূত কবি অ্যাডোনিস।

এবারের উৎসবে সম্পৃক্ত হয়েছেন ২৪টি দেশের দুই শতাধিক শিল্পী-সাহিত্যিক।

প্রত্যাশা, দেশের সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এবং বিশ্বসাহিত্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্তির। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এই সাহিত্য উৎসবে ভাষার সীমানা পেরোনো আন্তর্জাতিক আবহ।

সপ্তমবারের মতো ২০১৭ সালের ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজক যাত্রিক। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে বাংলা একাডেমি। একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন, কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হল, লন, ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষ, কসমিক টেন্ট ও নজরুল মঞ্চজুড়ে সাজানো হয়েছে আয়োজন। এ ছাড়া উৎসবের চারপাশজুড়ে দেশ-বিদেশের রকমারি বইয়ের সম্ভারে সেজেছে বুক স্টলগুলো।

উৎসবের প্রথম দিনে তাঁবুতে তাঁবুতে চলেছে সাহিত্যের আলোচনা। মঞ্চে হয়েছে সাহিত্যবিষয়ক বহুমাত্রিক আলাপ। উঠে এসেছে গল্প-উপন্যাস বিষয়ে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের ভাবনা। সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত লনে ভেসে বেড়িয়েছে গানের সুর। কোনো মঞ্চে প্রদর্শিত হয়েছে, আবার কোনো মঞ্চে হয়েছে কবিদের স্বরচিত কবিতাপাঠ।

বর্ষণমুখর সকালে বাহাই সম্প্রদায়ের অনুসারীদের আধ্যাত্মিক গান আর কবিতার সুর মূর্ছনায় শুরু হয় আন্তর্জাতিক এই সাহিত্য সম্মেলন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল মণিপুরি থিয়েটারের পরিবেশনায় ‘পুং চোলম’। এর পরই শুরু হয় উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতায় বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং উৎসবের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ৎ সিদ্দিকী ও আহসান আকবার।

উদ্বোধনী মঞ্চেই উন্মোচিত হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’। লিট ফেস্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন অ্যাডোনিস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। ‘মুজিব’ বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টার।

সবার বক্তব্য শেষে ফরাসি, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষায় লিট ফেস্টের উদ্বোধন ঘোষণা করেন কবি অ্যাডোনিস। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় অধিবেশনের পালা। শুরুতেই কায়সার হকের সঞ্চালনায় অ্যাডোনিস বলেন, ‘ধর্মের ব্যবহারের কারণে রাজনীতি দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোয় ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা নয়। এ দুটিকে এক করে ফেলা হয়। অথচ ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়। ধর্মকে অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে মেলানো ঠিক নয়। ’

ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যকথা : দুপুরে বর্ধমান হাউসের সামনে এক অধিবেশনে উঠে আসে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যকথা। সাহিত্য প্রসঙ্গে সেই অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘সত্তরের দশকে আমি লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। প্রথমে নিজের চেষ্টায়, পরে কবি রফিক আজাদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত লিখতে শুরু করি। সব সময় জনপ্রিয় লেখকই হতে চেয়েছি। জনপ্রিয়তার ধারা অব্যাহত রাখতে টেলিভিশনে নাটকও লিখেছি। ’

‘লাইফ ইন লেটার্স’ শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল। অক্ষর, শব্দ ও বাক্যের মধ্যে একজন লেখকের জীবনযাত্রা কিভাবে অতিবাহিত হয়, সেশনে সেই বিষয়ে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন দুই সাহিত্যিক।

তিন ক্যাটাগরিতে চারজন পেলেন জেমকন সাহিত্য পুরস্কার : প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকা লিট ফেস্টে দেওয়া হলো জেমকন সাহিত্য পুরস্কার। এ বছর একজন প্রবীণ কবি এবং তিনজন তরুণ লেখককে এ সম্মাননা দেয় জেমকন গ্রুপ। গতকাল সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলানয়তনে এ পুরস্কার ঘোষণা করেন জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদ। পরে তিনি চার লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

কবি মোহাম্মদ রফিককে তাঁর ‘দু’টি গাথাকাব্য’ কাব্যগ্রন্থের জন্য এ বছর পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন আট লাখ টাকার চেক। তরুণ কথাসাহিত্যিক আশরাফ জুয়েল ও মামুন অর রশিদ যৌথভাবে পেলেন জেমকন তরুণ সাহিত্য পুরস্কার। তাঁরা প্রত্যেকেই পান ৫০ হাজার টাকার চেক। জেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার পেলেন নুসরাত নুসিন। পুরস্কার হিসেবে তিনি পান এক লাখ টাকার চেক। এ ছাড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেককে উত্তরীয়, বই, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।

অন্যান্য অধিবেশন : দিনভর নানা অধিবেশনে মুখর ছিল বাংলা একাডেমি। এর মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘মুজিব : টেকিং হিস্টোরি টু দ্য নেক্সট জেনারেশন’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান সিদ্দিক মুজিব, গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’র শিল্পী সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়, যুক্তরাজ্যের ‘গ্রান্টা’র অনলাইন সম্পাদক লুক নাঈমা, আরজু ইসমাইল ও ভারতের সাহিত্যিক জেরি পিনটো। একই সময় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘দ্য শর্ট অব আইটি’ শীর্ষক অধিবেশনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যিক নাদিম জামানের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের সাহিত্যিক নাদিরা কবির বার্ব, পাকিস্তানের আমির হুসাইন ও ডেইলি স্টারের সাংবাদিক সালাউদ্দিন ইমাম।

ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষে ‘বিউটিফুল এনিম্যালস’ শীর্ষক অধিবেশনে গ্রান্টার সম্পাদনা সহযোগী এলিনেয়র চান্ডালারের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক লরেন্স অসবর্ন। কসমিক টেন্টে ‘বাংলার নারী, দুর্জয় ঘাঁটি’ শীর্ষক অধিবেশনে টেলিভিশন উপস্থাপিকা মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরী ও মাসুদা ভাট্টি।

প্রথম দিনের শেষ আকর্ষণ ছিল শেরিফ আল সায়ারের সঞ্চালনায় ‘রোহিঙ্গা ও মানবতা’ শীর্ষক আলোচনা। এতে অংশ নেন বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী, সম্পদ বড়ুয়া, হারুন উর রশীদ ও তপোধীর ভট্টাচার্য। তাতে বক্তারা আশা করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে এবং চাপমুক্ত হবে বাংলাদেশ।

এদিনের নানা অধিবেশনের মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘স্টেজিং স্টোরিজ’ অধিবেশনে অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও যুক্তরাজ্যের নাট্যকার-চলচ্চিত্র নির্মাতা ডেভিড হেয়ার। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন টেলিভিশন অভিনেতা ইরেশ যাকের। কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘ফেক নিউজ’ শীর্ষক অধিবেশনে সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক গর্গ চট্টোপাধ্যায়, ব্লগার আরিফ জেবতিক, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেল। লনে ‘ওয়ার্ডস অব কনসিয়েন্স : পোয়েট্রি অ্যান্ড অ্যাক্টিভিজম’ শীর্ষক অধিবেশনে লুক্সেমবার্গ রিভিউয়ের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ শেহজার দোজার সঞ্চালনায় আলোচনা করেন নওশিন ইউসুফ, কায়সার হক ও সোফিয়া ওয়াকার।

ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষে ‘দ্য বেঙ্গলিস : এ রেস ডিভাইডেড’ শীর্ষক অধিবেশনে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ডেভিডদারের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন ভারতীয় সাহিত্যিক সুদীপ চক্রবর্তী, কুশনভা চৌধুরী, ইসতিয়াক আহমেদ ও অনন্যা কবির। কসমিক টেন্টে ‘গল্পকার : সীমান যখন কেন্দ্র’ শীর্ষক অধিবেশনে গল্পকার সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন সৈয়দ আজাদ, কানু বসু মিশ্রা, মেরিনা নাসরিন ও মাসুদুল হক। নজরুল মঞ্চে ছিল ‘কবিতা : কিশোর মান্নান ও আবৃত্তি’ শীর্ষক পরিবেশনা।

একসঙ্গে ছয়টি অধিবেশন শুরু হয় বিকেল সোয়া ৪টায়। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ম্যাজিকাল টেলস’ অধিবেশনে নিজের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন নাইজেরিয়ার কথাসাহিত্যিক বেন ওকরি। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক অশোক ফেরারি। কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘সাহিত্যের স্বদেশ বিদেশ’ শীর্ষক অধিবেশনে জাহিদ সোহাগের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন নাজমুন নেসা, আলীম আজিজ, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী ও মোজাফফর হোসেন। লনে ছিল ‘কস্টিক ওয়ার্কপ্লেস অ্যান্ড কমিউটস’ শীর্ষক অধিবেশন। এতে হংকংয়ের এশিয়ান লিটারি এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা কেলি ফাকনারের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন কানাডার ঔপন্যাসিক ডেভিড স্যাজলি। ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষে ‘আমেরিকা : এশিয়াস সেটিং সান’ শীর্ষক অধিবেশনে ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহানের সঞ্চালনায় অর্থনীতিবিষয়ক প্রাবন্ধিক ডোমিনিক জিগলার, ফিন্যানশিয়াল টাইমসের এশিয়াবিষয়ক সম্পাদক ভিক্টর ম্যালেট, যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক লরেন্স অসবর্ন ও জাপানের টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ কিংসটন আলোচনায় অংশ নেন। কসমিক টেন্টে ‘মিসরুল ব্রিটানিয়া’ শিরোনামে একক বক্তব্য দেন প্রাবন্ধিক রড্রিক ম্যাথুয়েজ। নজরুল মঞ্চে ‘এমপারসেন্ড’ শীর্ষক অধিবেশনে তরুণ কবিরা কবিতা আবৃত্তি করেন।


মন্তব্য