kalerkantho


সাবেক হয়ে গেলেন এস কে সিনহা

কে পাচ্ছেন পরবর্তী দায়িত্ব?

নিজস্ব প্রতিবেদক / এম বদি-উজ-জামান   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কে পাচ্ছেন পরবর্তী  দায়িত্ব?

ফাইল ছবি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এসংক্রান্ত নথি গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী এখন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে আইন মন্ত্রণালয়। পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যত দেশের প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কবে নাগাদ প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে তা কেউ বলছেন না।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার একক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের পর এখন অপেক্ষার পালা কবে রাষ্ট্রপতি ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন;  ১৯ নম্বর হেয়ার রোডের ২২তম বাসিন্দা কে হচ্ছেন।

এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়ে গেছে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, এখন রাষ্ট্রপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির একক এখতিয়ার।

বিদেশে অবস্থানরত বিচারপতি এস কে সিনহা গত ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে জমা দেন। এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয় তা। ১১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পদত্যাগপত্র পৌঁছে। সংবিধানের ৯৬(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। পরে তা গতকাল আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব মো. জয়নুল আবেদীন গতকাল সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ অবস্থায় পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগে তাড়াহুড়ো দেখছেন না রাষ্ট্রপতি। কারণ ইতিমধ্যেই আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ও দায়িত্বভার গ্রহণ না দেওয়া পর্যন্ত বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

কে হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ায় ২২তম প্রধান বিচারপতি কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা চলছে। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনরত বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকেই শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হবে নাকি অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে তা নির্ভর করছে রাষ্ট্রপতির ওপর।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করিবেন। ’ 

বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের পর এখন আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি রয়েছেন। তাঁরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা (অবসরে যাবেন ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর), বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর), বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী (অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর), বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী (অবসরে যাবেন ২০২৩  সালের ২৫ সেপ্টেম্বর) এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার (অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি)। এখন আপিল বিভাগে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হবে নাকি তাঁকে ডিঙিয়ে আপিল বিভাগের অন্য কোনো বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হবে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। তবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার যেমন রীতি রয়েছে, তেমনি অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ বিচারপতিকেও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নজির রয়েছে।

বিচারপতি এস কে সিনহা ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বে থাকার কথা ছিল। কারণ সংবিধানের ৯৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা যায়। কিন্তু উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনর্বহালের বিধানসংবলিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ে কিছু অভিমত দিয়ে সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। এ রায় নিয়ে সংসদ অধিবেশনেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। ওই রায় ও রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাবও পাস হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ আলোচনায় অংশ নিয়ে রায়ের সমালোচনা করেন। এ অবস্থায় গত ২ অক্টোবর এক মাসের ছুটি নেওয়ার পর তিনি তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। পরে তিনি বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর বিদেশে থাকার কথা উল্লেখ ছিল। রাষ্ট্রপতির অনুমতি পাওয়ার পর গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন তিনি।

এর আগে নিজ বাসভবনের সামনে অপেক্ষমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অসুস্থ না। আমি চলে যাচ্ছি। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আবার ফিরে আসব। ’ কিন্তু এর পরদিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট একটি বিবৃতি দেন। এ বিবৃতিতে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করতে আপিল বিভাগের অন্য পাঁচ বিচারপতির অস্বীকৃতির কথা বলা হয়। বিচারপতি এস কে সিনহা গত ৬ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যান। এরপর সেখান থেকে দেশে না ফিরে ১০ নভেম্বর কানাডা যান। কানাডা যাওয়ার সময় তিনি পদত্যাগ করেন।


মন্তব্য