kalerkantho


ভাঙা সড়কে বিপদ ইজি বাইক

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভাঙা সড়কে বিপদ ইজি বাইক

পূর্ব তেঘরিয়া মোড়লবাড়ির কাছ ঘেঁষে একটি প্রশস্ত নালা সুরমা নদীতে গিয়ে পড়েছে। ময়লা জমতে জমতে এখন নালাটি বন্ধ।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, পাড়ার তাহের উদ্দিন নালায় ময়লা ফেলছেন। প্রায় একই সময় আশপাশের বাসার কয়েকজন নারীকেও নালায় গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলতে দেখা গেল।

তাহের উদ্দিন বললেন, ‘ইকানো হকলবালাই আমরা ময়লা পালাই। দেখইন্যা, হকলে লেফটিনের টেংকিও দেলাইছে। ময়লায় খালি মশা আর মশা। ড্রেইন ছাফ করতো কেউ আয় না। ’

আলাপকালে ময়লা ফেলতে আসা নারী-পুরুষ সবাই জানালেন, এ নালায় তাঁরা নিয়মিতই ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। ড্রেনে যে শুধু ময়লা ফেলেন তা নয়, আশপাশের বাসার শৌচাগারের পাইপ সরাসরি এসে পড়েছে নালায়।

শুধু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার সমস্যাই নয়, সুনামগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দারা ঠিকমতো পানিও পাচ্ছে না।

পৌর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ শতাংশ বাসিন্দার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। ৬১৮টি নলকূপের মধ্যে অকেজো হয়ে গেছে অর্ধেকেরও বেশি। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে পানি উঠছে না। এ ছাড়া মোটর বসিয়ে অনেকেই পৌরসভার সরবরাহ পাইপ থেকে বেশি পানি টেনে নিচ্ছে।

এ ছাড়া শহরের অধিকাংশ সড়কই ভাঙাচোরা। এসব সড়কে বিপদজ্জনকভাবে চলাচল করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (ইজি বাইক)। সরেজমিনে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ময়লা ফেলার কারণে শহরের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় নালা থাকলেও ঢাকনা নেই। তাই রাতবিরাতে দুর্ঘটনায় পড়ছে লোকজন। এ ছাড়া চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি বাসিন্দাকে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়নি। ৩ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো নালা নেই।

সকাল সাড়ে ১১টায় শহরের ষোলঘর আবাসিক এলাকায় পবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনের মূল সড়কে আব্দুল মতিন হাঁটছিলেন দ্রুতগতিতে। সেন্টারের উত্তর মাথায় ঢাকনাবিহীন নালার সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ান। এই প্রতিবেদককে নালার ঢাকনাবিহীন গর্ত দেখিয়ে বলেন, ‘ইকানো হিদিন এক ব্যাটা রাইতে আছাড় খাইয়া পইড়া এখন আসপাতালে আছে। রাতে পরতিদিন এক্সিডেন্ট অয়। ইটা ঠিক না করলে আরো বড় এক্সিডেন্ট অইব। অনেকবার খইছি, তার বাদেও ঠিক কইরা দেয় না। ’

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম উকিল বলেন, ‘আমাদের পাড়াটি ঘনবসতি ও দরিদ্র একটি এলাকা। মানুষের সচেতনতার অভাবে ময়লা-আবর্জনা ড্রেনে ফেলে। দারিদ্র্যের কারণে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণের সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই ড্রেনে বাথরুমের লাইন করে দিয়েছে। ’

একই পাড়ার বাসিন্দা সংবাদপত্র ব্যবসায়ী মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমাদের পাড়ার বেশির ভাগ মানুষই ড্রেনে বাথরুমের লাইন দিয়েছে। ফলে সকালে ও রাতে উৎকট দুর্গন্ধ নাকে লাগে। তা ছাড়া মোটর লাগিয়ে চুরি করে অনেকে পৌরসভার লাইন থেকে পানি তোলায় পানির স্পিডও কম। ’ তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তার তুলনায় কিছু এলাকার ড্রেন নিচু হওয়ায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ড্রেনের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষায় এ সমস্যা প্রকট হয়। ’

শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাজিলা বেগম বলেন, ‘আমরার ড্রেন নাই, পানি নাই। এখনো আমরা গেরামে বাস করি। কেউ কইতো না আমরা পৌরসভার মানুষ। ’

জানা গেছে, পুরো শহরকে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য চলতি বছর মন্ত্রণালয়ে ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত পৌরসভায় নালা আছে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে মাত্র ১৬ কিলোমিটার; কিন্তু প্রয়োজন প্রায় ৫০ কিলোমিটার নালা। ১০ হাজার গ্রাহকের পানির চাহিদা থাকলেও মাত্র এক হাজার ৬০০ পরিবার পানি সরবরাহের আওতায় এসেছে।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ২৮ কিলোমিটার এলাকার মানুষ পানি সুবিধা পাচ্ছে। পানির সমস্যা সমাধান করতে আধুনিক ‘সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী বছর এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এই প্লান্টটি চালু হলে প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা পানি সরবরাহের আওতায় আসবে।

পৌরসভার পানি শাখার তত্ত্বাবধায়ক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষকে পানি সরবরাহের আওতায় আনতে পেরেছি। আমাদের চাহিদা এর চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। তা ছাড়া কিছু গ্রাহক আমাদের লাইনে মোটর লাগিয়ে পানি চুরি করায় অন্য নাগরিকদের পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। ’

পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কালীকৃষ্ণ পাল বলেন, ‘আমরা এখন প্রায় ৫০ শতাংশ নাগরিককে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় আনতে পেরেছি। আরো প্রায় ২০ কিলোমিটার ড্রেন হয়ে গেলে কোনো সমস্যা থাকবে না। ’

পৌর মেয়র আয়ূব বখত জগলুল বলেন, ‘আমরা সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করি ড্রেনেজ ও পানি সমস্যাসহ নাগরিকদের সব সমস্যা সমাধানের। কিন্তু নাগরিকরা সচেতনতার অভাবে ড্রেন ময়লায় ভরে ফেলছে। আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পরিষ্কার করে আসতে না আসতেই আবার ড্রেন ময়লায় ভরে ফেলে। তা ছাড়া অতীতে পরিকল্পনা ছাড়া ড্রেন নির্মিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনসহ নানা সমস্যা হচ্ছে। ’

আগের দিন সোমবার রাতে শহরের মোহাম্মদপুরে সৈয়দ উমেদ হারুনির মাজারে ওরসে যেতে ইজিবাইকে রওনা দেন তেঘরিয়ার রুবেলসহ কয়েক যুবক। ষোলঘর পয়েন্ট থেকে ধানসিঁড়ি অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিনের বাসার সামনের সেতু পর্যন্ত পুরো রাস্তায়ই অসংখ্য গর্ত। তাই ইজিবাইক কখনো এপাশে, কখনো ওপাশে হেলে পড়ছিল। রুবেল ও তাঁর বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে খিস্তিখেউর করছিলেন।

রুবেল মিয়া বলেন, ‘ইলা বাদ রাস্তা। মানুষ কিলা চলে ইতাবাদি। ইতা ঠিক করার কেউ নাইনি। (এত খারাপ রাস্তা। মানুষ কিভাবে চলে এই সড়কে? সড়ক সংস্কারের কেউ কি নেই?’

জানা গেছে, গত বন্যার পর এই হাল হয়েছে রাস্তার। বহু আগে নির্মিত এই সড়ক নিচু হওয়ায় এখন বন্যা হলেই ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর পৌরসভা বন্যার পর নিয়মিত সংস্কার করে।

পৌরবাসীরা জানায়, শহরের ষোলঘর, নবীনগর, তেঘরিয়া, বড়পাড়া, ধানসিঁড়ি এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাটই ভাঙাচোরা। প্রায় প্রতিবছর বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যায়। সে কারণে নিয়মিতই রাস্তা ভেঙে যায়। গত বন্যায় রাস্তাঘাট ভাঙার পর এখনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি সড়ক সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরে মোট ৬৩ দশমিক ২১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। পাকা রাস্তা প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। বাকি রাস্তা কাঁচা ও ইটের সলিং দেওয়া। বর্ধিত এলাকায় রাস্তাঘাট নতুন করে নির্মিত হলেও এখনো পাকা করা হয়নি। তা ছাড়া বিচ্ছিন্ন পাড়াগুলোর সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগও নেই।

এদিকে সড়কগুলোতে রাজত্ব করছে ইজিবাইক। ছোট্ট এই শহরে প্রায় এক হাজার ৫০০ ইজিবাইক রয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৭০০টির। বিপজ্জনক এই ইজিবাইক প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। গত বছর অন্তত চারজন ইজিবাইক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। পাশাপাশি সড়কে যানজটের সৃষ্টি করছে এই ইজিবাইক। প্রতিদিন শহরের ছয়টি পয়েন্টে অতিরিক্ত ইজিবাইকের কারণে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর বলেন, ‘শহরের ফুটপাত নেই। ইজিবাইকগুলো বিপজ্জনক। রাস্তাঘাটও ভাঙা। কিছু এলাকায় রাস্তাঘাট বড় করার জন্য ভাঙা হলেও অন্যান্য এলাকায় সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সব এলাকায় পৌরসভার রাস্তা দখলমুক্ত করতে পারলে শহরে যানজট কমবে। ’

উন্নয়নকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, একটি আধুনিক পৌর শহরের অভ্যন্তরে রাস্তাঘাট এখনো অনাধুনিক। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে রাস্তাঘাট। সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করলে শহরের সৌন্দর্য ফিরবে। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাট সংস্কার করাও জরুরি বলে জানান তিনি।

 

পৌর মেয়র আয়ূব বখত জগলুল বলেন, ‘রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার কাজ আমি প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই করছি। আগের জনপ্রতিনিধিরা মুখ চেয়ে অনেক কাজ করতে পারেননি, যার ফলে এখন অবকাঠামো উন্নয়ন করতে সমস্যা হচ্ছে। ’

মেয়র বলেন, বন্যায় তলিয়ে যায়—এমন সড়ক নিয়ে তাঁরা নতুন করে চিন্তাভাবনা করছেন। তা ছাড়া পুরো পৌর এলাকাই এখন রাস্তাঘাটের আওতায় আছে বলে তিনি জানান।


মন্তব্য