kalerkantho


মনোনয়ন দৌড়ে প্রবীণদের সঙ্গে নবীনরাও

অসীম মণ্ডল, সিরাজগঞ্জ   

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মনোনয়ন দৌড়ে প্রবীণদের সঙ্গে নবীনরাও

তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ বেলকুচি উপজেলা আর যমুনা নদীর ভাঙনকবলিত চৌহালী উপজেলা নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ-৫ সংসদীয় আসন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ডজনখানেক নেতা মনোনয়ন দৌড়ে নেমেছেন।

তাঁদের মধ্যে প্রবীণরা যেমন আছেন, তেমনি নবীনরাও রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা-সমাবেশ করছেন। তাঁরা ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিচ্ছেন। এ ছাড়া এলাকাজুড়ে নেতা-নেত্রীদের ছবিসংবলিত পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়েছেন তাঁরা। অনেকেই কেন্দ্রীয় নেতাদের এলাকায় এনে ত্রাণ বিতরণ করে এলাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। ভূরিভোজের আয়োজন করেও কেউ কেউ জমজমাট নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার শুরু করেছেন।

বড় দুই দলের বাইরে জামায়াতও তত্পর রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশ নিতে স্থানীয় নেতারা সব রকম প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সাধারণ ভোটাররা আশা করছেন, মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে সব দলই যেন প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, দায়িত্বশীলতা, সততা, ত্যাগ, শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন ইত্যাদি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

জাতীয় সংসদের ৬৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটি দুই উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। বেলকুচির ভোটার দুই লাখ ৭৬ হাজার ৮৭২ জন এবং চৌহালীর ভোটার এক লাখ দুই হাজার ৪৫৬ জন। হালনাগাদ হলে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

এলাকার লোকজন বলে থাকে যে স্বাধীনতার পর এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন সেই দলই দেশ পরিচালনা করেছে। তাই এ আসনের দিকে সব দলেরই বিশেষ নজর থাকে।

উল্লেখ্য, এ আসন (তখন সিরাজগঞ্জ-৫ আসনটি ছিল বেলকুচি ও কামারখন্দ নিয়ে) থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল লতিফ বিশ্বাস ৫১ হাজার ৬৮১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শহীদুল্লাহ খান ৪৮ হাজার ৩৬০ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি মোজাম্মেল হক এক লাখ ১৮ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আবদুল লতিফ বিশ্বাস ৫৪ হাজার ৬৩০ ভোট পান। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুর রহমান ১৪ হাজার ১৮১ ভোট পেয়েছিলেন।

২০০৮ সালে এ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস হয়। বেলকুচি ও চৌহালী নিয়ে গঠন করা হয় সিরাজগঞ্জ-৫ আসন। ওই বছর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আবদুল লতিফ বিশ্বাস এক লাখ ১৯ হাজার ৫৮২ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চারদলীয় জোটের মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের এক লাখ ১৯ হাজার ৩৩০ ভোট পান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান রতনকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মজিদ মণ্ডল বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

আওয়ামী লীগ : আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে যাঁরা মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে তাঁদের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ। এ আলোচনায় বর্তমান সংসদ সদস্য মণ্ডল গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডলের নামও রয়েছে। তবে দলের অনেকের মতে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগামী নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন নাও চাইতে পারেন। তাঁর ছেলে মণ্ডল গ্রুপের পরিচালক আব্দুল মমিন মণ্ডল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে দলের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরই মধ্যে তাঁকে নিয়ে বেশ কয়েকটি জনসভা হয়েছে এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যেই আব্দুল মমিন মণ্ডল প্রচার চালাচ্ছেন। বর্তমান সংসদ সদস্যের সমর্থকরাও এরই মধ্যে তাঁকে নিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড করছেন।

অন্যদিকে সাবেক মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী লতিফ বিশ্বাস বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিকটজন ও আত্মীয়দের জনপ্রতিনিধি করায় এবং দলের নেতৃত্বে আনায় অনেকেরই বিরাগভাজন হয়েছেন তিনি। গুঞ্জন আছে যে তাঁরা লতিফ বিশ্বাসের প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও বর্তমান সংসদ সদস্য ও অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন। তবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব সময় মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখের ভাগিদার এ নেতা।

এদিকে বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ মণ্ডল ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের মধ্যে বিরোধ এখন অনেকটাই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দুজনেই একে অন্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁরা নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করেন।

সাবেক ছাত্রনেতা মীর মোশারফ হোসেন এলাকায় সভা-সমাবেশ করে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করে সমর্থক, কর্মী ও ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গণসংযোগ করছেন। ঢাকার বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর মোশারফ বেলকুচির বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর সু-সম্পর্ক থাকায় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তিনি লবিং করছেন। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারেও  আশাবাদী তিনি।

অন্যদিকে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় যুবলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মুশফিকুর রহমান মোহন বলেন, ‘আমি মনে করি, মানুষের জন্য ভালো কিছু করার চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই। তাই আগামী নির্বাচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে জনকল্যাণে কাজ করে যাব। ’

বিএনপি : এ আসনে বিএনপির নবীন ও প্রবীণ কয়েকজন নেতা মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন। দলের নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ছয় নেতা একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চান। তাঁদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ওরিয়েন্টাল গ্রুপের পরিচালক রকিবুল করিম খান পাপ্পু। দলীয় কর্মকাণ্ডে আন্তরিকতার কারণে অল্প দিনের ব্যবধানে তিনি জেলা বিএনপির সদস্য থেকে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করে তিনি সবার নজর কেড়েছেন। দলের জেলা নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তাঁর। দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রকিবুল করিম খান পাপ্পুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণে দলের নেত্রী তাঁকেই মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও রকিবুল করিম খান বিভিন্ন দুর্যোগে এলাকাবাসীর মধ্যে ত্রাণ সহায়তা ও চিকিত্সাসেবা দিয়ে আসছেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি।

রকিবুল করিম খান বলেন, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ গোছানোর কাজ করে চলেছেন।

বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় বিএনপির সহপ্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীমও প্রচার চালাচ্ছেন। তিনিও নেতাকর্মীদের পাশে থাকার পাশাপাশি এলাকার দুর্গত ও অসহায় মানুষকে সহায়তা করে আসছেন।

বেলকুচি ডিগ্রি কলেজসহ একাধিক বিদ্যাপিঠের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রয়াত আবু কোরাইশ খানের ছেলে গোলাম মওলা খান বাবলু নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লবিং করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ২০০৮ সালে তিনি ও মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের বিএনপির মনোনয়নপ্রার্থী ছিলেন। পরে তিনি মঞ্জুর কাদেরকে ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি এলাকার উন্নয়ন, নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সব সময় কাজ করে যাচ্ছেন।

চৌহালী আসন থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের নীরবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তাঁকে নেতাকর্মীরা পাচ্ছে না। তিনি খোঁজখবরও রাখেন না বলে নেতাকর্মীরা জানায়। এ কারণে তাঁর প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপির মনোনয়ন চান সাবেক প্রতিমন্ত্রী আনসার আলী সিদ্দিকীর ছেলে চৌহালী উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আব্দুল্লাহ আল মামুন, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম খান।

জামায়াত : অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে বসে নেই জামায়াত। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, দলের প্রার্থী হিসেবে বেলকুচি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আলী আলমকে নিয়ে অনেকটা কৌশলে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।


মন্তব্য